০২:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ঝুঁকি আর সংকটে চারঘাটের প্রাথমিক বিদ্যালয়

শাহিনুর সুজন
  • আপডেট সময়ঃ ১০:৫১:৫৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ২১ বার পড়া হয়েছে।

শাহিনুর সুজন,স্টাফ রিপোর্টারঃ

শিক্ষাজীবনের শুরু হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। অথচ রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতেই দেখা দিয়েছে নানা সংকট।কোথাও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চলছে পাঠদান, কোথাও আবার শ্রেণিকক্ষের তীব্র সংকট। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রধান শিক্ষক না থাকার সমস্যা। ফলে বিদ্যালয়গুলোর স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ও ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। জেলার অন্যান্য উপজেলাতেও কমবেশি একই সংকট থাকলেও চারঘাট যেন এর একটি স্পষ্ট চিত্র।

উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, চারঘাটে ৭৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ২৬টি বিদ্যালয়ের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। এসব বিদ্যালয় গুলোতে শ্রেণিকক্ষের সংকট রয়েছে। অন্যদিকে ৭৩টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪৫টিতেই বর্তমানে প্রধান শিক্ষক নেই। সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে চলছে এসব বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম।

উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্র আরও জানায়, ঝুঁকিপূর্ণ ২৬টি বিদ্যালয়ের ভবন অপসারণ করে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য চাহিদা দিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে তালিকা পাঠানো হয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হলেও অনেক বিদ্যালয়ে এখনো পুরোনো ভবনেই পাঠদান চলছে।

ভাঙা ক্লাসরুমে ঝুঁকিপূর্ণ পাঠদান
সরেজমিন বিদ্যালয়গুলো ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও নতুন ভবন নির্মাণ হলেও সেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। আবার যে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দুই শতাধিক, সেখানে শ্রেণিকক্ষ রয়েছে মাত্র তিনটি। ভবনের অবস্থাও জরাজীর্ণ। এতে একদিকে নতুন ভবনের যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না, অন্যদিকে শিক্ষার্থীর চাপ থাকা বিদ্যালয়গুলোতে শ্রেণিকক্ষ সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। নতুন ভবন বরাদ্দের অব্যবস্থাপনার কারণে এ অবস্থা তৈরি হয়েছে।

ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ২৬টি বিদ্যালয়ের অধিকাংশ ভবন পাঁচ থেকে ১০ বছর আগেই ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। এরপরও বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় ঝুঁকি নিয়েই পাঠদান চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এরই মধ্যে কোনো কোনো বিদ্যালয়ে ফ্যান খুলে পড়া কিংবা ভবনের ছাদের বিভিন্ন অংশ খসে পড়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হাবিবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একতলা ভবন নির্মিত হয় ১৯৯৩ সালে। ২০১৮ সালে উপজেলা প্রকৌশল বিভাগ ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে। তবুও ২১৮ জন শিক্ষার্থী এখনো ওই জরাজীর্ণ তিন রুমের ভবনে মাত্র ১৭ সেট বেঞ্চে পড়াশোনা করছে। নির্মাণকালে দেওয়া ৩৯ সেট বেঞ্চের মধ্যে ২২টি নষ্ট হয়ে গেছে। ক্লাস নেওয়ার সময় সহকারী শিক্ষিকা ছাদের রডসহ ফ্যান খুলে পড়ে আহতও হয়েছেন। বিদ্যালয়টি এখন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাছে আতঙ্কের জায়গায় পরিণত হয়েছে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ সাইফুর রহমান বলেন, বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেও প্রতিকার পাইনি। ১৯৯৪ সালের পর নতুন বেঞ্চও পাওয়া যায়নি। শিক্ষার্থীরা ভাঙা ভবনে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে ক্লাস করছে। প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে।

একই অবস্থা উপজেলার ধর্মহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে দুই শতাধিক শিক্ষার্থীর ক্লাসরুম মাত্র তিনটি। সেই ভবনও ১০ বছর আগে ঝুকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। উপরের ছাদে ফাটল ধরেছে। মেঝেতে উইপোকা মাটি তুলে বাসা বেঁধেছে। তারমধ্যেই ঝুঁকি নিয়ে চলছে পাঠদান।

ধর্মহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বজলুর রশীদ বলেন, শ্রেনীকক্ষ ও টয়লেট সবই ঝুঁকিপূর্ণ। দুই শতাধিক শিক্ষার্থী ভাঙা তিনটা শ্রেণীকক্ষে গাদাগাদি করে ক্লাস করছে। মাঝে মধ্যেই ছাদের ঢালাইয়ের অংশ খসে পড়ছে। না জানি কি বিপদ হয় কখন। আল্লাহকে ডাকি আর পড়াই।

একই অবস্থা দেখা গেছে খোর্দগোবিন্দপুর, ভাটপাড়া, ইউসুফপুর, মেরামতপুরসহ ২৬টি বিদ্যালয়ে।

খোর্দগোবিন্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর অভিভাবক মোহাম্মদ রায়হান বলেন, রামচন্দ্রপুর, ঝাউবোনাসহ কয়েকটি বিদ্যালয়ে ভবন দেওয়া হয়েছে। সেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১০০ জনেরও কম। নতুন ভবন ব্যবহারই হয়না ঠিকমত। কিন্তু আমাদের এ বিদ্যালয়ে ভবন দেবে গেছে। মাঝেই দূর্ঘটনা ঘটছে। দ্রুত প্রতিকার না হলে বহু শিক্ষার্থী হতাহতের মত ঘটনা ঘটতে পারে।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান দিয়ে চলছে ৪৫ বিদ্যালয়
সরেজমিন শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভবনের সংকটের পাশাপাশি প্রধান শিক্ষক না থাকাও বিদ্যালয়গুলোর ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করছে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী সহকারী শিক্ষকদের প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি নিয়মিত পাঠদানও করতে হচ্ছে। এতে বিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রম তদারকিতে চাপ তৈরি হচ্ছে। যেসব বিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষের সংকট রয়েছে সেখানকার ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকরা নতুন ভবন পেতে তেমন উদ্যোগও নিতে পারছেন না।

অভিভাবকদের অভিযোগ, কোনো কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা নিয়মিত উপস্থিতি ও সময়ানুবর্তিতা বজায় রাখছেন কি না, তা তদারকির ব্যবস্থাও দুর্বল। ফলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার মান নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে গ্রামের নিম্নআয়ের পরিবারের সন্তানদের জন্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ই শিক্ষার প্রধান অবলম্বন। এসব বিদ্যালয়ের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে পিছিয়ে পড়বে এসব পরিবারের সন্তানরা।

চারঘাটের নন্দনগাছী এলাকার বাসিন্দা খাইরুল ইসলাম বলেন, তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারের অনেকেই সন্তানদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিবর্তে কিন্ডারগার্টেনসহ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাচ্ছেন। ফলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মূলত নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এ অবস্থায় বিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও প্রধান শিক্ষকের মত ব্যবস্থাপনা সংকট তাদের শিক্ষাজীবনে আরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

উপজেলা প্রধান শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোঃ মখলেসুর রহমান বলেন, ৪৫টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। সহকারী শিক্ষকরা সেখানে রুটিন দায়িত্ব পালন করছেন। মামলাসহ নানা কারণে এ পদগুলো খালি ছিল। দ্রুতই প্রধান শিক্ষক পদায়ন হবে বলে আমরা আশ্বাস পেয়েছি।

সাবেক শিক্ষক ও উপজেলা নাগরিক কমিটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বাদশা বলেন, প্রাথমিক শিক্ষা একটি শিশুর শিক্ষাজীবনের ভিত্তি তৈরি করে। এ পর্যায়ে নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ, পর্যাপ্ত শিক্ষক, কার্যকর বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করা জরুরি। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিবেচনা না করে ভবন নির্মাণ এবং অন্যদিকে বেশি শিক্ষার্থী থাকা বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষ সংকট রেখে দেওয়ার বিষয়টি পরিকল্পনার ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।

চারঘাট উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোছাঃ ফাতেমা খাতুন বলেন, পড়াশোনা উপরে কিছুটা প্রভাব পড়ছে। ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়গুলোর ভবন অপসারণ ও নতুন ভবন নির্মাণের জন্য চাহিদা পাঠানো হয়েছে। প্রধান শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি নিয়েও কাজ চলমান রয়েছে।

ট্যাগসঃ

নিউজটি শেয়ার করুন

বিস্তারিত লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

আপলোডকারীর তথ্য

ঝুঁকি আর সংকটে চারঘাটের প্রাথমিক বিদ্যালয়

আপডেট সময়ঃ ১০:৫১:৫৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শাহিনুর সুজন,স্টাফ রিপোর্টারঃ

শিক্ষাজীবনের শুরু হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। অথচ রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতেই দেখা দিয়েছে নানা সংকট।কোথাও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চলছে পাঠদান, কোথাও আবার শ্রেণিকক্ষের তীব্র সংকট। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রধান শিক্ষক না থাকার সমস্যা। ফলে বিদ্যালয়গুলোর স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ও ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। জেলার অন্যান্য উপজেলাতেও কমবেশি একই সংকট থাকলেও চারঘাট যেন এর একটি স্পষ্ট চিত্র।

উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, চারঘাটে ৭৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ২৬টি বিদ্যালয়ের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। এসব বিদ্যালয় গুলোতে শ্রেণিকক্ষের সংকট রয়েছে। অন্যদিকে ৭৩টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪৫টিতেই বর্তমানে প্রধান শিক্ষক নেই। সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে চলছে এসব বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম।

উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্র আরও জানায়, ঝুঁকিপূর্ণ ২৬টি বিদ্যালয়ের ভবন অপসারণ করে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য চাহিদা দিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে তালিকা পাঠানো হয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হলেও অনেক বিদ্যালয়ে এখনো পুরোনো ভবনেই পাঠদান চলছে।

ভাঙা ক্লাসরুমে ঝুঁকিপূর্ণ পাঠদান
সরেজমিন বিদ্যালয়গুলো ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও নতুন ভবন নির্মাণ হলেও সেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। আবার যে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দুই শতাধিক, সেখানে শ্রেণিকক্ষ রয়েছে মাত্র তিনটি। ভবনের অবস্থাও জরাজীর্ণ। এতে একদিকে নতুন ভবনের যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না, অন্যদিকে শিক্ষার্থীর চাপ থাকা বিদ্যালয়গুলোতে শ্রেণিকক্ষ সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। নতুন ভবন বরাদ্দের অব্যবস্থাপনার কারণে এ অবস্থা তৈরি হয়েছে।

ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ২৬টি বিদ্যালয়ের অধিকাংশ ভবন পাঁচ থেকে ১০ বছর আগেই ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। এরপরও বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় ঝুঁকি নিয়েই পাঠদান চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এরই মধ্যে কোনো কোনো বিদ্যালয়ে ফ্যান খুলে পড়া কিংবা ভবনের ছাদের বিভিন্ন অংশ খসে পড়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হাবিবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একতলা ভবন নির্মিত হয় ১৯৯৩ সালে। ২০১৮ সালে উপজেলা প্রকৌশল বিভাগ ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে। তবুও ২১৮ জন শিক্ষার্থী এখনো ওই জরাজীর্ণ তিন রুমের ভবনে মাত্র ১৭ সেট বেঞ্চে পড়াশোনা করছে। নির্মাণকালে দেওয়া ৩৯ সেট বেঞ্চের মধ্যে ২২টি নষ্ট হয়ে গেছে। ক্লাস নেওয়ার সময় সহকারী শিক্ষিকা ছাদের রডসহ ফ্যান খুলে পড়ে আহতও হয়েছেন। বিদ্যালয়টি এখন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাছে আতঙ্কের জায়গায় পরিণত হয়েছে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ সাইফুর রহমান বলেন, বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেও প্রতিকার পাইনি। ১৯৯৪ সালের পর নতুন বেঞ্চও পাওয়া যায়নি। শিক্ষার্থীরা ভাঙা ভবনে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে ক্লাস করছে। প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে।

একই অবস্থা উপজেলার ধর্মহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে দুই শতাধিক শিক্ষার্থীর ক্লাসরুম মাত্র তিনটি। সেই ভবনও ১০ বছর আগে ঝুকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। উপরের ছাদে ফাটল ধরেছে। মেঝেতে উইপোকা মাটি তুলে বাসা বেঁধেছে। তারমধ্যেই ঝুঁকি নিয়ে চলছে পাঠদান।

ধর্মহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বজলুর রশীদ বলেন, শ্রেনীকক্ষ ও টয়লেট সবই ঝুঁকিপূর্ণ। দুই শতাধিক শিক্ষার্থী ভাঙা তিনটা শ্রেণীকক্ষে গাদাগাদি করে ক্লাস করছে। মাঝে মধ্যেই ছাদের ঢালাইয়ের অংশ খসে পড়ছে। না জানি কি বিপদ হয় কখন। আল্লাহকে ডাকি আর পড়াই।

একই অবস্থা দেখা গেছে খোর্দগোবিন্দপুর, ভাটপাড়া, ইউসুফপুর, মেরামতপুরসহ ২৬টি বিদ্যালয়ে।

খোর্দগোবিন্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর অভিভাবক মোহাম্মদ রায়হান বলেন, রামচন্দ্রপুর, ঝাউবোনাসহ কয়েকটি বিদ্যালয়ে ভবন দেওয়া হয়েছে। সেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১০০ জনেরও কম। নতুন ভবন ব্যবহারই হয়না ঠিকমত। কিন্তু আমাদের এ বিদ্যালয়ে ভবন দেবে গেছে। মাঝেই দূর্ঘটনা ঘটছে। দ্রুত প্রতিকার না হলে বহু শিক্ষার্থী হতাহতের মত ঘটনা ঘটতে পারে।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান দিয়ে চলছে ৪৫ বিদ্যালয়
সরেজমিন শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভবনের সংকটের পাশাপাশি প্রধান শিক্ষক না থাকাও বিদ্যালয়গুলোর ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করছে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী সহকারী শিক্ষকদের প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি নিয়মিত পাঠদানও করতে হচ্ছে। এতে বিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রম তদারকিতে চাপ তৈরি হচ্ছে। যেসব বিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষের সংকট রয়েছে সেখানকার ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকরা নতুন ভবন পেতে তেমন উদ্যোগও নিতে পারছেন না।

অভিভাবকদের অভিযোগ, কোনো কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা নিয়মিত উপস্থিতি ও সময়ানুবর্তিতা বজায় রাখছেন কি না, তা তদারকির ব্যবস্থাও দুর্বল। ফলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার মান নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে গ্রামের নিম্নআয়ের পরিবারের সন্তানদের জন্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ই শিক্ষার প্রধান অবলম্বন। এসব বিদ্যালয়ের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে পিছিয়ে পড়বে এসব পরিবারের সন্তানরা।

চারঘাটের নন্দনগাছী এলাকার বাসিন্দা খাইরুল ইসলাম বলেন, তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারের অনেকেই সন্তানদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিবর্তে কিন্ডারগার্টেনসহ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাচ্ছেন। ফলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মূলত নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এ অবস্থায় বিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও প্রধান শিক্ষকের মত ব্যবস্থাপনা সংকট তাদের শিক্ষাজীবনে আরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

উপজেলা প্রধান শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোঃ মখলেসুর রহমান বলেন, ৪৫টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। সহকারী শিক্ষকরা সেখানে রুটিন দায়িত্ব পালন করছেন। মামলাসহ নানা কারণে এ পদগুলো খালি ছিল। দ্রুতই প্রধান শিক্ষক পদায়ন হবে বলে আমরা আশ্বাস পেয়েছি।

সাবেক শিক্ষক ও উপজেলা নাগরিক কমিটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বাদশা বলেন, প্রাথমিক শিক্ষা একটি শিশুর শিক্ষাজীবনের ভিত্তি তৈরি করে। এ পর্যায়ে নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ, পর্যাপ্ত শিক্ষক, কার্যকর বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করা জরুরি। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিবেচনা না করে ভবন নির্মাণ এবং অন্যদিকে বেশি শিক্ষার্থী থাকা বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষ সংকট রেখে দেওয়ার বিষয়টি পরিকল্পনার ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।

চারঘাট উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোছাঃ ফাতেমা খাতুন বলেন, পড়াশোনা উপরে কিছুটা প্রভাব পড়ছে। ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়গুলোর ভবন অপসারণ ও নতুন ভবন নির্মাণের জন্য চাহিদা পাঠানো হয়েছে। প্রধান শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি নিয়েও কাজ চলমান রয়েছে।