০২:৩৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬

চারঘাটে যুবলীগ নেতার পুকুরে বিএনপি নেতাদের খনন তৎপরতা—তিন ফসলি জমি হুমকিতে

শাহিনুর সুজন, চারঘাট (রাজশাহী):
  • আপডেট সময়ঃ ০৯:১০:৩৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬
  • / ২৯ বার পড়া হয়েছে।

 

চারঘাট (রাজশাহী) প্রতিনিধিঃ

রাজশাহীর চারঘাট উপজেলায় তিন ফসলি কৃষিজমিতে অবৈধভাবে পুকুর খনন করে সেই মাটি ইটভাটায় সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় প্রভাবশালী বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে।

এলাকাবাসীর দাবি, যুবলীগ নেতা শামীম আহমেদের উদ্যোগে নেওয়া পুকুর খনন প্রকল্পটি বর্তমানে বিএনপি নেতাদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। এতে একদিকে কৃষিজমি নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশ, সড়ক অবকাঠামো ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার শলুয়া ইউনিয়নের চামটা কানজগাড়ি মাঠ এলাকায় গত এক সপ্তাহ ধরে প্রায় ১৬ বিঘা তিন ফসলি জমিতে পুকুর খননের কাজ চলছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী,শলুয়া ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও বর্তমান ইউনিয়ন যুবলীগের সহসভাপতি শামীম আহমেদ বিভিন্ন কৃষকের কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে প্রায় ৪০ বিঘা জমিতে পুকুর খননের উদ্যোগ নেন। এর মধ্যে ২৪ বিঘা জমিতে ইতোমধ্যে পুকুর খনন করে কয়েকজন মৎস্য চাষির কাছে বিক্রি করা হয়েছে।

পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় বাকি ১৬ বিঘা জমিতে খনন কাজ বন্ধ হয়ে যায়। তবে বর্তমানে সেই পুকুর খননের দায়িত্ব স্থানীয় বিএনপি নেতারা নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ জমির মধ্যে বিএনপি নেতা মো. জাহাঙ্গীর আলমের প্রায় তিন বিঘা জমিও রয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পুকুর খনন কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিচ্ছেন চারঘাট উপজেলা তাতীদলের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম গনি এবং বিএনপি নেতা রিক্ত আহমেদ। তাদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পুনরায় এ খনন কাজ শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।

অভিযোগ রয়েছে, খননকৃত মাটি এমএনএম ইটভাটাসহ স্থানীয় কয়েকটি ইটভাটায় সরবরাহ করা হচ্ছে। এলাকাবাসীর দাবি, এমএনএম ভাটার মালিক ছামিউল আলম নিজেও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং তার ভাটায় নিয়মিত এসব মাটি নেওয়া হচ্ছে। রাতের আঁধারে ১০ চাকার ভারী ড্রাম ট্রাকে করে মাটি পরিবহন করা হচ্ছে, যা আইন লঙ্ঘনের পাশাপাশি জনদুর্ভোগ বাড়াচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, গত বছর একই স্থানে পুকুর খননের চেষ্টা করলে উপজেলা ভূমি প্রশাসন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে কাজ বন্ধ করে দেয় এবং ব্যবহৃত এক্সকাভেটর অকেজো করে দেয়। তবে চলতি বছরে আবারও রাতের আঁধারে খনন কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, ভারী যানবাহনে মাটি পরিবহনের কারণে শিশাতলা থেকে আড়ানী পর্যন্ত প্রায় ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে চলমান সড়কের কার্পেটিং কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইতোমধ্যে সড়কের বিভিন্ন স্থানে দেবে যাওয়ার ঘটনাও দেখা গেছে।

পুকুর খননের স্থান সংলগ্ন একটি গুরুত্বপূর্ণ কালভার্ট রয়েছে, যা দিয়ে অন্তত ১৫ থেকে ২০টি গ্রামের পানি নিষ্কাশন হয়। স্থানীয়দের আশঙ্কা, পুকুর খননের ফলে কালভার্টটি বন্ধ হয়ে গেলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে। এছাড়া স্থানীয়দের দাবি, এই পুকুর সম্পূর্ণভাবে খনন করা হলে আশপাশের প্রায় ৪০০ একর কৃষিজমি স্থায়ীভাবে চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়বে।

স্থানীয় কৃষক আনসার উদ্দিন (৭৫) বলেন,এই জমিতে আগে তিন ফসল হতো। এখন পানি বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক জমিতে শুধু রসুন চাষ করতে হচ্ছে। পুকুর খনন হলে বর্ষায় পুরো এলাকা পানিতে তলিয়ে যাবে।

তিনি আরও বলেন, যারা খনন করছে তারা প্রভাবশালী। তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলতে গেলেই সমস্যা হয়, তাই সবাই চুপ করে আছে।

বিএনপি নেতা এমএনএম ইটভাটার মালিক ছামিউল আলম বলেন, আমি আগের মালিকের কাছ থেকে পুকুরটি নিয়ে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী খনন করছি। যুবলীগ নেতা শামীম আহমেদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সাথে কোন সম্পর্ক নেই।

চারঘাট উপজেলা তাতীদলের সভাপতি অভিযোগ অস্বীকার করে জাহিদুল ইসলাম গনি বলেন,গত বছর প্রশাসন অভিযান চালানোর পর আমি কাজ বন্ধ করে দিই। এ বছর পুকুর খননের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

শলুয়া ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন,পুকুরের সঙ্গে আমার কিছু জমি আছে, সেখানে পানি জমে থাকায় চাষাবাদ হয় না। তাই পুকুরের জন্য টেন্ডার দিয়েছি।

এ বিষয়ে যুবলীগ নেতা শামীম আহমেদ বলেন, এই বিষয়ে কোন কথা বলতে চাইনা যখন দেখা হবে তখন কথা বলবো বলে ফোন কেটে দেয়, একাধিক বার ফোন করলে ফোন বন্ধ করে দেয়।

শলুয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লালন সরকার বলেন,কিছু অসাধু ব্যক্তি রাতের আঁধারে তিন ফসলি জমিতে পুকুর খনন করছে। আমরা খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রাহাতুল করিম মিজান বলেন,অবৈধভাবে পুকুর খননের খবর পেয়েছি।তেলের অভিযান নিয়ে ব্যস্ত থাকায় ওখানে যাওয়া সম্ভব হয়নি, দ্রুত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।

ট্যাগসঃ

নিউজটি শেয়ার করুন

বিস্তারিত লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

আপলোডকারীর তথ্য

চারঘাটে যুবলীগ নেতার পুকুরে বিএনপি নেতাদের খনন তৎপরতা—তিন ফসলি জমি হুমকিতে

আপডেট সময়ঃ ০৯:১০:৩৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬

 

চারঘাট (রাজশাহী) প্রতিনিধিঃ

রাজশাহীর চারঘাট উপজেলায় তিন ফসলি কৃষিজমিতে অবৈধভাবে পুকুর খনন করে সেই মাটি ইটভাটায় সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় প্রভাবশালী বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে।

এলাকাবাসীর দাবি, যুবলীগ নেতা শামীম আহমেদের উদ্যোগে নেওয়া পুকুর খনন প্রকল্পটি বর্তমানে বিএনপি নেতাদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। এতে একদিকে কৃষিজমি নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশ, সড়ক অবকাঠামো ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার শলুয়া ইউনিয়নের চামটা কানজগাড়ি মাঠ এলাকায় গত এক সপ্তাহ ধরে প্রায় ১৬ বিঘা তিন ফসলি জমিতে পুকুর খননের কাজ চলছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী,শলুয়া ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও বর্তমান ইউনিয়ন যুবলীগের সহসভাপতি শামীম আহমেদ বিভিন্ন কৃষকের কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে প্রায় ৪০ বিঘা জমিতে পুকুর খননের উদ্যোগ নেন। এর মধ্যে ২৪ বিঘা জমিতে ইতোমধ্যে পুকুর খনন করে কয়েকজন মৎস্য চাষির কাছে বিক্রি করা হয়েছে।

পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় বাকি ১৬ বিঘা জমিতে খনন কাজ বন্ধ হয়ে যায়। তবে বর্তমানে সেই পুকুর খননের দায়িত্ব স্থানীয় বিএনপি নেতারা নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ জমির মধ্যে বিএনপি নেতা মো. জাহাঙ্গীর আলমের প্রায় তিন বিঘা জমিও রয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পুকুর খনন কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিচ্ছেন চারঘাট উপজেলা তাতীদলের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম গনি এবং বিএনপি নেতা রিক্ত আহমেদ। তাদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পুনরায় এ খনন কাজ শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।

অভিযোগ রয়েছে, খননকৃত মাটি এমএনএম ইটভাটাসহ স্থানীয় কয়েকটি ইটভাটায় সরবরাহ করা হচ্ছে। এলাকাবাসীর দাবি, এমএনএম ভাটার মালিক ছামিউল আলম নিজেও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং তার ভাটায় নিয়মিত এসব মাটি নেওয়া হচ্ছে। রাতের আঁধারে ১০ চাকার ভারী ড্রাম ট্রাকে করে মাটি পরিবহন করা হচ্ছে, যা আইন লঙ্ঘনের পাশাপাশি জনদুর্ভোগ বাড়াচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, গত বছর একই স্থানে পুকুর খননের চেষ্টা করলে উপজেলা ভূমি প্রশাসন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে কাজ বন্ধ করে দেয় এবং ব্যবহৃত এক্সকাভেটর অকেজো করে দেয়। তবে চলতি বছরে আবারও রাতের আঁধারে খনন কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, ভারী যানবাহনে মাটি পরিবহনের কারণে শিশাতলা থেকে আড়ানী পর্যন্ত প্রায় ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে চলমান সড়কের কার্পেটিং কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইতোমধ্যে সড়কের বিভিন্ন স্থানে দেবে যাওয়ার ঘটনাও দেখা গেছে।

পুকুর খননের স্থান সংলগ্ন একটি গুরুত্বপূর্ণ কালভার্ট রয়েছে, যা দিয়ে অন্তত ১৫ থেকে ২০টি গ্রামের পানি নিষ্কাশন হয়। স্থানীয়দের আশঙ্কা, পুকুর খননের ফলে কালভার্টটি বন্ধ হয়ে গেলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে। এছাড়া স্থানীয়দের দাবি, এই পুকুর সম্পূর্ণভাবে খনন করা হলে আশপাশের প্রায় ৪০০ একর কৃষিজমি স্থায়ীভাবে চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়বে।

স্থানীয় কৃষক আনসার উদ্দিন (৭৫) বলেন,এই জমিতে আগে তিন ফসল হতো। এখন পানি বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক জমিতে শুধু রসুন চাষ করতে হচ্ছে। পুকুর খনন হলে বর্ষায় পুরো এলাকা পানিতে তলিয়ে যাবে।

তিনি আরও বলেন, যারা খনন করছে তারা প্রভাবশালী। তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলতে গেলেই সমস্যা হয়, তাই সবাই চুপ করে আছে।

বিএনপি নেতা এমএনএম ইটভাটার মালিক ছামিউল আলম বলেন, আমি আগের মালিকের কাছ থেকে পুকুরটি নিয়ে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী খনন করছি। যুবলীগ নেতা শামীম আহমেদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সাথে কোন সম্পর্ক নেই।

চারঘাট উপজেলা তাতীদলের সভাপতি অভিযোগ অস্বীকার করে জাহিদুল ইসলাম গনি বলেন,গত বছর প্রশাসন অভিযান চালানোর পর আমি কাজ বন্ধ করে দিই। এ বছর পুকুর খননের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

শলুয়া ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন,পুকুরের সঙ্গে আমার কিছু জমি আছে, সেখানে পানি জমে থাকায় চাষাবাদ হয় না। তাই পুকুরের জন্য টেন্ডার দিয়েছি।

এ বিষয়ে যুবলীগ নেতা শামীম আহমেদ বলেন, এই বিষয়ে কোন কথা বলতে চাইনা যখন দেখা হবে তখন কথা বলবো বলে ফোন কেটে দেয়, একাধিক বার ফোন করলে ফোন বন্ধ করে দেয়।

শলুয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লালন সরকার বলেন,কিছু অসাধু ব্যক্তি রাতের আঁধারে তিন ফসলি জমিতে পুকুর খনন করছে। আমরা খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রাহাতুল করিম মিজান বলেন,অবৈধভাবে পুকুর খননের খবর পেয়েছি।তেলের অভিযান নিয়ে ব্যস্ত থাকায় ওখানে যাওয়া সম্ভব হয়নি, দ্রুত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।