০৩:৩৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬

টাঙ্গাইলের মধুপুরে ভাওয়াল গড় লাল মাটির পথে শাল-গজারির মায়াবী রাজ্য

মধুপুরের ভাওয়ালগড় ঘুরে এসে শামীম রেজা
  • আপডেট সময়ঃ ১১:০৭:২৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬
  • / ৫৩ বার পড়া হয়েছে।

 

মধুপুরের ভাওয়ালগড় ঘুরে এসে শামীম রেজা

শহরের ব্যস্ততা, যানবাহনের কোলাহল আর ইট-পাথরের জীবন থেকে একটু দূরে গেলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। চারদিকে সবুজের সমারোহ, লালচে মাটির আঁকাবাঁকা পথ, সারি সারি শাল-গজারি গাছ আর প্রকৃতির অপার নীরবতা। এমনই এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশের দেখা মেলে টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার ভাওয়াল গড় এলাকায়।

সম্প্রতি ভাওয়াল গড় ঘুরে দেখা গেছে, প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশে থাকা এ অঞ্চলটি যেন ভ্রমণপিপাসু মানুষের জন্য এক অন্যরকম প্রশান্তির ঠিকানা। রাস্তার দুই পাশে সবুজ বন, কোথাও ঘন গাছপালা, কোথাও আবার লাল মাটির উঁচু-নিচু পথ সব মিলিয়ে ভ্রমণের প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে ওঠে উপভোগ্য।

ভূপ্রকৃতিগতভাবে মধুপুর গড় বাংলাদেশের একটি স্বতন্ত্র উঁচু ভূমি। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, মধুপুর গড়ের দক্ষিণাংশ ভাওয়াল গড় এবং উত্তরাংশ মধুপুর গড় নামে পরিচিত। পার্শ্ববর্তী প্লাবনভূমির তুলনায় এ অঞ্চল প্রায় এক থেকে দশ মিটার উঁচু।
এই গড়াঞ্চলের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর বনভূমি। শাল বা গজারি গাছ এ অঞ্চলের প্রধান বৃক্ষ। এর সঙ্গে রয়েছে নানা প্রজাতির গাছপালা, লতাগুল্ম ও বনজ উদ্ভিদ। ফলে বছরের বিভিন্ন সময়ে ভাওয়াল গড়ের প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন রূপে ধরা দেয়।

ভাওয়াল গড়ের পথে হাঁটতে কিংবা গাড়িতে চলতে চলতে চোখে পড়ে লাল মাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা গাছের সারি। কোথাও গাছের ফাঁক দিয়ে রোদ এসে পড়ছে মাটিতে, আবার কোথাও গাছের ঘন ছায়ায় তৈরি হয়েছে শীতল পরিবেশ। প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এ দৃশ্য নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়।

মধুপুর ও ভাওয়াল গড়াঞ্চল শুধু সৌন্দর্যের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়; বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বন ও জীববৈচিত্র্যের দিক থেকেও এর গুরুত্ব অনেক। মধুপুর গড়াঞ্চলের প্রাকৃতিক বনে শাল-গজারি ও বিভিন্ন বনজ প্রজাতির উপস্থিতি রয়েছে। টাঙ্গাইল বন বিভাগের আওতায় মধুপুর গড়াঞ্চলে বিভিন্ন বন রেঞ্জ ও বিট রয়েছে।

একসময় এ বনাঞ্চল ছিল আরও বিস্তৃত ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। সময়ের সঙ্গে বনভূমির ওপর নানা চাপ তৈরি হয়েছে। বন উজাড়, কৃষিজমির সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন কারণে প্রাকৃতিক বন ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে।

তবে এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ভাওয়াল গড়ের প্রকৃতি এখনো মানুষকে টানে। বিশেষ করে শীত ও মনোরম আবহাওয়ার সময়ে পরিবার-পরিজন কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে অনেকেই সবুজের এই রাজ্যে ছুটে আসেন। কেউ প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করেন, কেউ ছবি তোলেন, আবার কেউ নিঃশব্দ পরিবেশে কিছুটা সময় কাটিয়ে ফিরে যান নাগরিক জীবনের ব্যস্ততায়।

ভাওয়াল গড় ঘুরে মনে হয় প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে সবসময় দূর পাহাড় কিংবা সমুদ্রের কাছে যেতে হয় না। দেশের মধ্যেই এমন কিছু জায়গা রয়েছে, যেখানে লাল মাটি আর শাল-গজারি বনের ছায়ায় দাঁড়িয়ে প্রকৃতিকে খুব কাছ থেকে অনুভব করা যায়।

টাঙ্গাইলের মধুপুরের এই গড়াঞ্চল তাই শুধু একটি বনভূমি নয়; এটি প্রকৃতি, ভূপ্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে মিশে থাকা এক জীবন্ত গল্প। ভাওয়াল গড়ের পথে একবার গেলে লাল মাটির সেই পথ, গাছের ছায়া আর নির্জন সবুজের স্মৃতি সহজে ভোলার নয়।

সহকারী বন সংরক্ষক রানা দেব জানান, আমরা প্রতিনিয়ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি বনকে সংরক্ষণ করতে। এবছরও ব্যাপক পরিমাণ বৃক্ষ রোপন করা হবে এই ভাওয়াল গড়ে। প্রকৃতি বাঁচলে বাঁচবে ভাওয়াল গড়। আর ভাওয়াল গড় বেঁচে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও দেখতে পাবে বাংলাদেশের এই অনন্য শাল-গজারির সবুজ পৃথিবী।

 

ট্যাগসঃ

নিউজটি শেয়ার করুন

বিস্তারিত লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

আপলোডকারীর তথ্য

টাঙ্গাইলের মধুপুরে ভাওয়াল গড় লাল মাটির পথে শাল-গজারির মায়াবী রাজ্য

আপডেট সময়ঃ ১১:০৭:২৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬

 

মধুপুরের ভাওয়ালগড় ঘুরে এসে শামীম রেজা

শহরের ব্যস্ততা, যানবাহনের কোলাহল আর ইট-পাথরের জীবন থেকে একটু দূরে গেলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। চারদিকে সবুজের সমারোহ, লালচে মাটির আঁকাবাঁকা পথ, সারি সারি শাল-গজারি গাছ আর প্রকৃতির অপার নীরবতা। এমনই এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশের দেখা মেলে টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার ভাওয়াল গড় এলাকায়।

সম্প্রতি ভাওয়াল গড় ঘুরে দেখা গেছে, প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশে থাকা এ অঞ্চলটি যেন ভ্রমণপিপাসু মানুষের জন্য এক অন্যরকম প্রশান্তির ঠিকানা। রাস্তার দুই পাশে সবুজ বন, কোথাও ঘন গাছপালা, কোথাও আবার লাল মাটির উঁচু-নিচু পথ সব মিলিয়ে ভ্রমণের প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে ওঠে উপভোগ্য।

ভূপ্রকৃতিগতভাবে মধুপুর গড় বাংলাদেশের একটি স্বতন্ত্র উঁচু ভূমি। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, মধুপুর গড়ের দক্ষিণাংশ ভাওয়াল গড় এবং উত্তরাংশ মধুপুর গড় নামে পরিচিত। পার্শ্ববর্তী প্লাবনভূমির তুলনায় এ অঞ্চল প্রায় এক থেকে দশ মিটার উঁচু।
এই গড়াঞ্চলের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর বনভূমি। শাল বা গজারি গাছ এ অঞ্চলের প্রধান বৃক্ষ। এর সঙ্গে রয়েছে নানা প্রজাতির গাছপালা, লতাগুল্ম ও বনজ উদ্ভিদ। ফলে বছরের বিভিন্ন সময়ে ভাওয়াল গড়ের প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন রূপে ধরা দেয়।

ভাওয়াল গড়ের পথে হাঁটতে কিংবা গাড়িতে চলতে চলতে চোখে পড়ে লাল মাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা গাছের সারি। কোথাও গাছের ফাঁক দিয়ে রোদ এসে পড়ছে মাটিতে, আবার কোথাও গাছের ঘন ছায়ায় তৈরি হয়েছে শীতল পরিবেশ। প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এ দৃশ্য নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়।

মধুপুর ও ভাওয়াল গড়াঞ্চল শুধু সৌন্দর্যের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়; বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বন ও জীববৈচিত্র্যের দিক থেকেও এর গুরুত্ব অনেক। মধুপুর গড়াঞ্চলের প্রাকৃতিক বনে শাল-গজারি ও বিভিন্ন বনজ প্রজাতির উপস্থিতি রয়েছে। টাঙ্গাইল বন বিভাগের আওতায় মধুপুর গড়াঞ্চলে বিভিন্ন বন রেঞ্জ ও বিট রয়েছে।

একসময় এ বনাঞ্চল ছিল আরও বিস্তৃত ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। সময়ের সঙ্গে বনভূমির ওপর নানা চাপ তৈরি হয়েছে। বন উজাড়, কৃষিজমির সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন কারণে প্রাকৃতিক বন ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে।

তবে এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ভাওয়াল গড়ের প্রকৃতি এখনো মানুষকে টানে। বিশেষ করে শীত ও মনোরম আবহাওয়ার সময়ে পরিবার-পরিজন কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে অনেকেই সবুজের এই রাজ্যে ছুটে আসেন। কেউ প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করেন, কেউ ছবি তোলেন, আবার কেউ নিঃশব্দ পরিবেশে কিছুটা সময় কাটিয়ে ফিরে যান নাগরিক জীবনের ব্যস্ততায়।

ভাওয়াল গড় ঘুরে মনে হয় প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে সবসময় দূর পাহাড় কিংবা সমুদ্রের কাছে যেতে হয় না। দেশের মধ্যেই এমন কিছু জায়গা রয়েছে, যেখানে লাল মাটি আর শাল-গজারি বনের ছায়ায় দাঁড়িয়ে প্রকৃতিকে খুব কাছ থেকে অনুভব করা যায়।

টাঙ্গাইলের মধুপুরের এই গড়াঞ্চল তাই শুধু একটি বনভূমি নয়; এটি প্রকৃতি, ভূপ্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে মিশে থাকা এক জীবন্ত গল্প। ভাওয়াল গড়ের পথে একবার গেলে লাল মাটির সেই পথ, গাছের ছায়া আর নির্জন সবুজের স্মৃতি সহজে ভোলার নয়।

সহকারী বন সংরক্ষক রানা দেব জানান, আমরা প্রতিনিয়ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি বনকে সংরক্ষণ করতে। এবছরও ব্যাপক পরিমাণ বৃক্ষ রোপন করা হবে এই ভাওয়াল গড়ে। প্রকৃতি বাঁচলে বাঁচবে ভাওয়াল গড়। আর ভাওয়াল গড় বেঁচে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও দেখতে পাবে বাংলাদেশের এই অনন্য শাল-গজারির সবুজ পৃথিবী।