চারঘাটে প্রশাসনের দায়সারা অভিযান, নিষেধাজ্ঞার মাঝেই জেলেদের ইলিশ শিকার
- আপডেট সময়ঃ ১০:০৪:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৫
- / ১২০ বার পড়া হয়েছে।

শাহিনুর সুজন, চারঘাট (রাজশাহী):
প্রজনন মৌসুমে মা-ইলিশ সংরক্ষণে সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি থাকলেও রাজশাহীর চারঘাটে চলছে ইলিশ শিকারের মহোৎসব। প্রশাসনের ঢিলেঢালা তদারকি ও দায়সারা অভিযানের সুযোগে স্থানীয় জেলেরা দিন-রাত নির্বিঘ্নে মা-ইলিশ শিকার করছে। অভিযান এলেও অনেকেই নৌকা নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছেন ভারতীয় সীমান্তের ভেতরে। এতে যেকোনো সময় বিএসএফের হাতে আটক বা গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে ভারতীয় জেলেরাও বাংলাদেশের নদীতে ঢুকে অবাধে ইলিশ ধরছে বলে অভিযোগ উঠেছে স্থানীয়দের মধ্যে।
চারঘাট উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, অক্টোবরের ২২ দিন (৪–২৫ অক্টোবর) মা-ইলিশ ডিম ছাড়তে নদীতে উঠে আসে। এ সময় পদ্মা নদীর জলসীমায় জাল ফেলা, মাছ ধরা, বহন, মজুত ও বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
তবে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে প্রশাসনের দুর্বলতা চোখে পড়ছে। গত ছয় দিনে তিনটি অভিযান পরিচালনা করা হলেও কোনো জাল, মাছ বা জেলে আটক হয়নি বলে জানিয়েছে উপজেলা মৎস্য দপ্তর।
গতকাল শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে ১১টা পর্যন্ত চারঘাটের পিরোজপুর ও রাওথা এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, রাতে ধরা মাছ নিয়ে নৌকাগুলো একের পর এক তীরে ভিড়ছে। আবার কেউ কেউ সকালেই নতুন করে জাল ফেলছে। তখন নদীতে ৩০টিরও বেশি নৌকা মাছ শিকার করছিল।
বাংলাদেশি জেলেদের পাশাপাশি ভারতীয় জেলের নৌকাও দেখা যায় পদ্মা নদীতে। এ সময় নদীপাড়ে ক্রেতা ও আড়তদারদেরও ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।
মাছ কিনতে আসা সেলিম রেজা বলেন,নিষেধাজ্ঞার আগে বাজারে ইলিশের দাম এত বেশি ছিল যে সাধারণ মানুষ কিনতেই পারত না। এখন ভোরে নদীর পাড়ে এলে একটু সস্তায় পাওয়া যায়। তাই এসেছি। তবে নিষেধাজ্ঞার সময়ও আড়তদাররা বেশি দাম চাইছে। তারপরও দেড় কেজি ছোট ইলিশ ৪০০ টাকায় কিনেছি।
স্থানীয় আড়তদার জিল্লুর রহমান বলেন,নদীতে রিটা, ঘাউরা, চিংড়ির সঙ্গে ইলিশও ধরছে জেলেরা। এগুলো আমরা কিনে অনলাইন ও মোবাইল অর্ডারে বিক্রি করছি। ব্যবসা বন্ধ রাখলে পরিবার চালানো যাবে না, তাই বিকল্পভাবে চালিয়ে নিচ্ছি।
নিষেধাজ্ঞার সময় সরকারিভাবে ২৫ কেজি চাল সহায়তা পেলেও নদীতে মাছ ধরছিলেন জেলে সাগর আলী। তিনি বলেন,আমি একা মাছ না ধরলে লাভ হবে না। সবাই নদীতে নেমে পড়েছে। প্রশাসন আগের মতো কঠোর না—দিনে এক-দুবার ঘুরে যায়, কাউকে কিছু বলে না। তাই আমরাও মাছ ধরছি। ভারতীয় জেলেরাও ধরছে।
চারঘাট নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ হুমায়ুন কবির বলেন,অভিযান চালালে জেলেরা নৌকা নিয়ে ভারতীয় সীমান্তে ঢুকে পড়ে। তখন তাদের আটক করা সম্ভব হয় না। তারা সীমান্ত অতিক্রম করায় যেকোনো সময় বিএসএফের হাতে আটক বা গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। কিন্তু জীবিকার টানে তারা মৃত্যুকেও তুচ্ছ ভাবছে।”
স্থানীয় জেলে সমিতির সভাপতি তাজমুল হক বলেন,ভারতীয় জেলেরা প্রায়ই আমাদের নদীতে ঢুকে মাছ ধরে নিয়ে যায়। তাদের কেউ আটক করে না। এতে আমাদের জেলেরা উৎসাহ পেয়ে সীমান্তে ঢুকে পড়ে। আগেও অনেকে বিএসএফের হাতে আটক হয়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছে, কেউ কেউ এখনো ভারতের কারাগারে।
রাওথা এলাকার বাসিন্দা গোলাম মোস্তফা বলেন,বিগত বছরগুলোতে যেমন কঠোর অভিযান হতো, এবার তেমনটা নেই। আগে অভিযান হলে জেলেরা নদীতে নামার সাহসই পেত না। কিন্তু এবার প্রশাসনের মনোযোগ কমে গেছে। পদ্মায় এখনো ইলিশ আসেনি—এটা ভুল। প্রতিদিনই মাছের পরিমাণ বাড়ছে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ইউসুফপুর ক্যাম্প কমান্ডার সাহেবুর রহমান বলেন,আমরা সীমান্ত এলাকায় সচেতনতা কার্যক্রম চালাচ্ছি যেন জেলেরা অন্য দেশের সীমান্তে না যায়। মসজিদে মাইকিংসহ প্রচারণা চলছে। মা-ইলিশ রক্ষায় সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে আমরা সতর্কভাবে দায়িত্ব পালন করছি।
সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন,নদীতে এখনো পর্যাপ্ত ইলিশ আসেনি বলে বড় অভিযান শুরু হয়নি। তবে কয়েক দিনের মধ্যেই জোরালো অভিযান শুরু হবে। জেলে সংগঠনগুলোকেও সতর্ক করা হয়েছে।










