রাজশাহী অঞ্চলের সেচে আসছে সৌরবিদ্যুতের নতুন দিগন্ত
- আপডেট সময়ঃ ০৬:৩৭:০৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
- / ৪৪ বার পড়া হয়েছে।

আলিফ হোসেন,তানোরঃ
রাজশাহীর তানোরসহ প্রচন্ড খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে কৃষির সঙ্গে সেচের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। শুষ্ক মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানি তুলে জমিতে সেচ দিতে গভীর নলকূপের ওপর নির্ভর করতে হয় কৃষকদের। ফলে কৃষি উৎপাদনের পাশাপাশি সেচ ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ, পানি ও পরিচালন ব্যয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এমন বাস্তবতায় বিদ্যুৎনির্ভর সেচব্যবস্থার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)।
জানা গেছে, বিএমডিএর পরিকল্পনা অনুযায়ী, পর্যায়ক্রমে প্রায় ১৫ হাজার গভীর নলকূপ সৌরবিদ্যুৎচালিত পাম্পে রূপান্তরের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে ২৫৩টি গভীর নলকুপ সৌরবিদ্যুত চালিত করা হয়েছে। সংস্থাটির দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এর মাধ্যমে বরেন্দ্রের সেচ ব্যবস্থায় সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও পরিচালন ব্যয় কমানোর সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। সৌর পাম্প থেকে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদিত হলে তা জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সম্ভাবনাও বিবেচনায় রয়েছে। উদ্যোগটির মূল লক্ষ্য শুধু সেচের জ্বালানি পরিবর্তন নয়; এর সঙ্গে পানি ব্যবস্থাপনা, সেচের দক্ষতা এবং কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ের বিষয়টিকেও যুক্ত করার কথা বলছে বিএমডিএ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে সময়মতো নিরবিচ্ছিন্ন সেচ নিশ্চিত করা এবং কৃষকের সেচ ব্যয় কমানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে। তবে এর প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে প্রকল্প বাস্তবায়ন, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার ওপর। বরেন্দ্রের বিভিন্ন এলাকার সেচ পরিস্থিতিও এক নয়। কোথাও পানির চাহিদা বেশি,কোথাও কম আবার
কোথাও বিদ্যমান সেচ অবকাঠামো পুরোপুরি কার্যকর নয়। এ কারণে সব এলাকায় একই ধরনের প্রকল্প গ্রহণের পরিবর্তে স্থানীয় প্রয়োজন ও অগ্রাধিকার বিবেচনায় এলাকা ভিত্তিক ছোট প্রকল্প নেয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সংস্থাটি। বিএমডিএ চেয়ারম্যান (সচিব পদমর্যাদা) কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিন বলেছেন, বরেন্দ্র অঞ্চলের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে কৃষককে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে। কোনো এলাকায় জমি অনাবাদি থাকবে, আবার অন্য এলাকায় বেশি সুযোগ-সুবিধা
থাকবে- এ ধরনের বৈষম্য কাম্য নয়। এ জন্য বরেন্দ্র অঞ্চলের ১৬টি জেলায় প্রয়োজন ও অগ্রাধিকার বিবেচনায় ছোট ছোট প্রকল্প গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেয়া হবে।
বিএমডিএর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, কৃষি, সেচ, পানি ব্যবস্থাপনা ও সৌরবিদ্যুতের সমন্বিত উন্নয়নের বিষয়টি সংস্থাটির বিভিন্ন পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। বরেন্দ্র অঞ্চলের বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনার মধ্যে ছোট আকারের কিছু প্রকল্প ইতোমধ্যে সরকারের সবুজ পাতায় স্থান পেয়েছে বলে বিএমডিএ চেয়ারম্যান জানিয়েছেন। পাশাপাশি মহানন্দা নদীকে ঘিরে একটি প্রকল্প অনুমোদনের কথা এবং বরেন্দ্র মেগা প্রকল্পের কাজের ফাইল এগিয়ে চলার তথ্যও তিনি জানিয়েছেন। প্রকল্প গ্রহণের আগে স্থানীয় কৃষক ও জনগণের সমস্যা ও প্রয়োজন জানার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন বিএমডিএ চেয়ারম্যান। তার মতে, মাঠপর্যায়ের বাস্তব চাহিদা বিবেচনায় প্রকল্প নেয়া হলে সীমিত সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার সুযোগ থাকে। নতুন প্রকল্পের পাশাপাশি বিদ্যমান সেচ অবকাঠামো সচল রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিএমডিএ সূত্রে জানা গেছে, সংস্থাটির কমান্ড এলাকার বিভিন্ন স্থানে নানা কারণে কিছু গভীর নলকূপ বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। এসব নলকূপের সমস্যা চিহ্নিত করে আসন্ন সেচ মৌসুম শুরুর আগেই সচল করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
বিএমডিএর নির্বাহী পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম খান বলেছেন, বরেন্দ্র অঞ্চলের কোনো জমি যেনো পানির অভাবে অনাবাদি না থাকে, সে বিষয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের আরো দায়িত্বশীল হতে হবে। বিভিন্ন সমস্যার কারণে বন্ধ থাকা গভীর নলকূপগুলোর সমস্যা চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধানের পাশাপাশি প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সরেজমিনে পরিদর্শনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তিনি পানি ও জ্বালানির অপচয় রোধ করে আধুনিক সেচব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন। প্রায় ১৫ হাজার গভীর নলকূপ পর্যায়ক্রমে সৌরচালিত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বরেন্দ্রের সেচ ব্যবস্থায় জ্বালানি ব্যবহারের ধরনে পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে পানি ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন, বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং কৃষকের সেচ ব্যয় কমানোর সম্ভাবনাও সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছে বিএমডিএ। তবে দীর্ঘমেয়াদি এ উদ্যোগের বাস্তব সুফল নিশ্চিত করতে সৌর অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ, সেচের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং এলাকার কৃষি ও পানির চাহিদাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।
এ দিকে সম্প্রতি রাজশাহীতে বিএমডিএর প্রধান কার্যালয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএমডিএ চেয়ারম্যান কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিন। সভায় নির্বাহী পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম খানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।আলোচনা সভায় বরেন্দ্র অঞ্চলের সেচ ব্যবস্থাকে আরো আধুনিক, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব করতে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) আওতাধীন গভীর নলকূপগুলো পর্যায়ক্রমে সৌরবিদ্যুৎচালিত পাম্পে রূপান্তরের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান (সচিব পদমর্যাদা) কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিন।
সরেজমিন দেখা গেছে,রাজশাহীর তানোরের সীমান্ত সংলগ্ন মোহনপুর উপজেলার ঘাষিগ্রাম ইউনিয়নের (ইউপি) বড় দেওপুর জেল নম্বর ৩৯, মৌজা বড় দেওপুর ও ১৩৪৬ নম্বর দাগে একটি সৌরবিদ্যুত চালিত গভীর নলকুপ স্থাপন করা হয়েছে।বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিএমডিএর উদ্যোগে সৌরবিদ্যুত চালিত গভীর নলকুপ স্থাপন করা হয়েছে।এটি স্থাপনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬৪ লাখ টাকা। এই গভীর নলকুপের স্কীমে প্রায় দুশ’বিঘা জমিতে নিরবিচ্ছিন্ন সেচ দেয়া হচ্ছে।বাকি সময় উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয গ্রীডে যোগ হচ্ছে। স্থানীয় কৃষক আব্দুল কাদের, নুরনবী ও সহীদুল ইসলাম বলেন,সৌরবিদ্যুত চালিত হওয়ায় এই গভীর নলকুপ থেকে তারা নিরবিচ্ছিন্ন সেচ দিতে পারছেন।তারা সৌরবিদ্যুত চালিত গভীর নলকুপ পেয়ে অনেক খুশি ও বিএমডিএর কাছে কৃতজ্ঞ। এবিষয়ে গভীর নলকুপ অপারেটর ফারুক হোসেন বলেন, ডিজেল চালিত সেচ পাম্প অনেক ব্যয়বহুল। বিদ্যুত চালিত পাম্পেও খরচ অনেক। এছাড়া লোডশেডিংয়ের কারণে বিদ্যুত চালিত পাম্প থেকে সব সময় নিরবচ্ছিন্ন সেচ পাওয়া যায় না। যে কারণে আমরা সৌরবিদ্যুৎ চালিত পাম্পের মাধ্যমে জমিতে সেচ দিয়ে থাকি। এতে খরচ অর্ধেকে নেমে এসেছে। এই পাম্পের মাধ্যমে কৃষকরা নিজের জমিতে সেচ দেয়ার পাশাপাশি অন্যের জমিতে সেচের পানি সরবরাহ করে বাড়তি অর্থ উপার্জন করতে পারছেন।
এদিকে সোমবার (২১সেপ্টেম্বর) বিএমডিএ রাজশাহী অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান ও নির্বাহী প্রকৌশলী (সেচ) এসএম দেলোয়ার হোসনসহ জাপানের একটি প্রতিনিধি দল বড় দেওপুর সৌরবিদ্যুত চালিত গভীর নলকুপের কার্যক্রম পরিদর্শন করে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

















