কালের বিবর্তনে যান্ত্রিক যুগে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার করাত পেশা
- আপডেট সময়ঃ ০৫:১৬:৫৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ৩৩ বার পড়া হয়েছে।

আলিফ হোসেন,তানোরঃ
একসময় গ্রামবাংলার অতি পরিচিত পেশা ছিল করাতি। গাছ কাটার দৃশ্য দেখতে করাতিদের চারপাশে ভিড় জমাতেন গ্রামের মানুষ। করাত টানার সময় গানের সুর আর ছন্দে মুখর হয়ে উঠত কর্মব্যস্ত পরিবেশ। কালের বিবর্তন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও জীবিকার তাগিদে পেশা পরিবর্তনের কারণে সেই ঐতিহ্যবাহী করাতি পেশা এখন হারিয়ে যেতে বসেছে।
রাজশাহীর তানোর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে একসময় করাত পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত (করাতি) মানুষের বসবাস ছিল। শুষ্ক মৌসুম এলেই তারা দলবেঁধে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে বড় বড় গাছ কাটতেন। এরপর সেই গাছ চিরে তৈরি করতেন কাঠের রুয়া, তক্তা, খুঁটি ও অন্যান্য সামগ্রী। গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে গাছ কাটা ও কাঠ প্রস্তুত করাই ছিল তাদের প্রধান জীবিকা।কাঁধে করাত, হাতে কুড়াল, দা ও মোটা দড়ি নিয়ে তারা গ্রামে গ্রামে ঘুরতেন। গৃহস্থের বাড়ির সামনে গিয়ে হাঁক দিতেন—গাছ চিরাবেন গাছ তাদের অপেক্ষায় থাকতেন গাছ কাটাতে চাওয়া গৃহস্থরা।
তবে সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাবে গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে যান্ত্রিক ‘স’ মিল। এতে হাতের করাত দিয়ে গাছ কাটা ও কাঠ চেরার কাজের চাহিদা অনেকটাই কমে গেছে। ফলে বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অনেক করাতিই এখন অন্য পেশায় যুক্ত হয়েছেন।নব্বইয়ের দশকের আগেও করাতিদের কাজ দেখতে পাড়ার মানুষ ভিড় করতেন। গানের তালে তালে করাত টানার দৃশ্য ছিল গ্রামের মানুষের কাছে বেশ আকর্ষণীয়। করাতিরা সাধারণত সকালে গুড় দিয়ে চিড়া-মুড়ি, পান্তাভাত কিংবা লাল আটার রুটি খেয়ে কাজে নেমে পড়তেন।
একটি করাতি দলে সাধারণত চার থেকে পাঁচজন গাছ কাটার কাজে নিয়োজিত থাকতেন। তাদের সঙ্গে একজন রান্নার দায়িত্ব পালন করতেন। শুষ্ক মৌসুমজুড়েই এভাবে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় গিয়ে কাজ করতেন তারা।
সে সময়ে মাটিতে গর্ত করে অথবা কাঠের কাঠামো তৈরি করে তার ওপর গাছ রেখে করাত চালানো হতো। এ পদ্ধতিতে গাছ কাটতে ওপর ও নিচে দুই থেকে ছয়জন পর্যন্ত শ্রমিকের প্রয়োজন হতো। বড় করাত দিয়ে গাছ চিরে বিভিন্ন আকারের কাঠ তৈরি করা হতো। এসব কাঠ দিয়ে ঘরের খুঁটি, তক্তা, আড় ও রুয়া তৈরি করা হতো। কাঠের আকার ও পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হতো মজুরি।
উপজেলার কলমা ও বাধাইড় ইউনিয়নের (ইউপি) বিভিন্ন এলাকায় কয়েকজন প্রবীণের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ বছর আগেও ঘর নির্মাণের জন্য বড় গাছ কেটে করাতিদের দিয়ে কাঠ প্রস্তুত করা হতো। তখন উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে একাধিক করাতি দল কাজ করত। স্থানীয়দের কাছেও তারা ছিলেন বেশ পরিচিত মুখ।প্রবীণরা জানান, করাতিদের কাজ শুধু জীবিকার মাধ্যমই ছিল না; গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে এটি ছিল গভীরভাবে সম্পৃক্ত একটি ঐতিহ্য। গাছ কাটার সময় করাতের ছন্দ ও শ্রমিকদের গান গ্রামের মানুষের মধ্যে আলাদা এক আবহ তৈরি করত। যান্ত্রিক করাতকলের বিস্তারের সঙ্গে সেই দৃশ্য এখন প্রায় হারিয়ে গেছে।
তানোর উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হযরত আলী মাস্টার বলেন, ‘করাতি পেশা এই অঞ্চলের মানুষের অতি প্রাচীন একটি ঐতিহ্যবাহী পেশা। কালের বিবর্তনে পেশাটি হারিয়ে যেতে বসেছে। উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা পেলে পেশাটিকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হতো।#




















