রাজস্থলী হাসপাতালে রোগী সেজে দুদকের অভিযান; ওষুধ গোপন ও অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ
- আপডেট সময়ঃ ০৯:৩২:৫৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
- / ১২ বার পড়া হয়েছে।

আলমগীর মানিক, রাঙামাটি:
রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ওষুধ বিতরণ, সরকারি বরাদ্দের অর্থ ব্যয়, বিল-ভাউচার তৈরি, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা ও চিকিৎসাসেবাসহ বিভিন্ন খাতে অনিয়মের প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। রোগীর ছদ্মবেশে হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে সেবার মান পর্যবেক্ষণ এবং নথিপত্র যাচাই করে এসব অসংগতি শনাক্ত করেন দুদকের কর্মকর্তারা। অভিযানে ওষুধ মজুত থাকা সত্ত্বেও রোগীদের ওষুধ না দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পাশাপাশি ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের প্রাথমিক আলামতও পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
রোববার (৮ নভেম্বর) সকাল ১১টা থেকে বিকেল পর্যন্ত দুদকের রাঙামাটি সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের পাঁচ সদস্যের একটি দল এ অভিযান পরিচালনা করে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং রোগীদের কাছ থেকে দুদকে জমা পড়া একাধিক অভিযোগের ভিত্তিতে এ অভিযান চালানো হয়।
অভিযান চলাকালে দুদকের কর্মকর্তারা প্রথমে রোগীর ছদ্মবেশে হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে গিয়ে চিকিৎসাসেবার বাস্তব চিত্র পর্যবেক্ষণ করেন। পরে হাসপাতালের ওষুধের স্টক, বিতরণ রেজিস্টার, বিভিন্ন আর্থিক নথি, বিল-ভাউচার, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাজিরা খাতা এবং চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির কার্যক্রম খতিয়ে দেখেন।
দুদকের অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তা জানান, সরেজমিনে গিয়ে তাঁরা দেখতে পান, হাসপাতালের স্টোরে ওষুধ মজুত থাকা সত্ত্বেও অনেক রোগীকে ওষুধ নেই বলে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে স্টোররুম যাচাই করে সংশ্লিষ্ট ওষুধের মজুত পাওয়া যায়। ওষুধের রেজিস্টারের সঙ্গে বাস্তব মজুতের হিসাবেও ঘাটতি ও অসংগতি লক্ষ্য করেছেন তাঁরা।
হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা পরিস্থিতিও ছিল উদ্বেগজনক। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, হাসপাতালের ওয়ার্ড ও শৌচাগারগুলো অত্যন্ত অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় রয়েছে। সাধারণ মানুষের জন্য এমন পরিবেশে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করাই কঠিন। স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থার এমন চিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে দুদকের অভিযান দল।
অভিযানে হাসপাতালের বিভিন্ন খাতের বরাদ্দ ও ব্যয়ের নথিপত্র পর্যালোচনা করে আর্থিক অনিয়মের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়ে কর্মকর্তারা জানান, এক খাতের বরাদ্দ অন্য খাতে ব্যয় দেখিয়ে বিল-ভাউচার তৈরি করার অসংগতি পাওয়া গেছে। কিছু ক্ষেত্রে এসব ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের প্রাথমিক আলামতও মিলেছে। সংশ্লিষ্ট নথির ফটোকপি সংগ্রহ করা হয়েছে।
এ ছাড়া হাসপাতালের আয়া নিয়োগ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, রোগীদের খাবার রান্নার ঘর এবং জেনারেটর পরিচালনার জন্য বরাদ্দকৃত জ্বালানি তেলের হিসাবেও অনিয়মের অভিযোগ ও অসংগতি পাওয়া গেছে। হাসপাতালের আল্ট্রাসনোগ্রাফি সেবা নিয়েও অসংগতি শনাক্ত করেছেন দুদকের কর্মকর্তারা। এ ছাড়া আল্ট্রাসনোগ্রাফি কক্ষের পরিবেশ ছিল অপরিচ্ছন্ন। দীর্ঘদিন ধরে কক্ষটি ব্যবহার করা হয়নি বলে তাঁদের কাছে মনে হয়েছে। ইসিজি মেশিনসহ অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জামও পরিদর্শন করেন অভিযান পরিচালনাকারীরা। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি যাচাই করতে গিয়ে বায়োমেট্রিক হাজিরা ও ম্যানুয়াল হাজিরা খাতার মধ্যে অসংগতি পাওয়া গেছে বলে জানিয়ে দুদকের কর্মকর্তারা জানান, অভিযানে পাওয়া সব নথিপত্র ও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে কার্যালয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হবে। এরপর পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশসহ প্রতিবেদন প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হবে। সেখান থেকে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দুদকের অভিযান পরিচালনাকারি রাঙামাটি সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক সরোয়ার হোসেন বলেন, বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ এবং রোগীদের একাধিক অভিযোগের ভিত্তিতে রাজস্থলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অভিযান চালানো হয়েছে। প্রাথমিক যাচাইয়ে ওষুধের হিসাব, বিল-ভাউচার, আয়া নিয়োগ, পরিচ্ছন্নতা, খাবার রান্নাঘর, জেনারেটরের তেলের হিসাবসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব বিষয় লিখিতভাবে প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হবে। পরবর্তী সময়ে নিয়ম অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে অভিযানের বিষয়ে হাসপাতালের এক মেডিকেল অফিসারের কাছে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, গণমাধ্যমে কথা বলার বিষয়ে তাঁদের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।



















