১০:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে না রেখে রাজশাহীতে রেফার, বাড়িতে মৃত্যু কিরণ বালার

ডিপিডি প্রতিবেদক
  • আপডেট সময়ঃ ০৬:০৫:৫৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
  • / ৪১ বার পড়া হয়েছে।

 

বাগমারা প্রতিনিধি
​‘স্যার, আমরা গরিব মানুষ, আমাদের টেকা-পয়সা নাই। এটি থুইয়্যা (রেখে) চিকিৎসা দেন, রাজশাহী লিয়্যা যাওয়ার সামর্থ্য নাই’ চিকিৎসকের পায়ে ধরেও আকুতি কাজ করেনি। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকের অবহেলা ও রেফার বাণিজ্যের শিকার হয়ে টাকার অভাবে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নয়, বরং বাড়িতে এনে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন ৬৩ বছর বয়সী কিরণ বালা।
​কিরণ বালা রাজশাহীর বাগমারার বাসিন্দা। জুতা পালিশের ফাঁকে দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে নিয়মিত পত্রিকা পড়া ভাইরাল সেই অনন্ত কুমারের মা তিনি। সম্প্রতি তাকে নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ ও ভিডিও প্রচার হয়েছিল।
​পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার (২৬ অক্টোবর) দুপুরে শ্বাসকষ্টজনিত অসুস্থতা নিয়ে কিরণ বালাকে বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। কিছুক্ষণ পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে রেফার (প্রেরণ) করার পরামর্শ দেন। এ সময় পরিবারের লোকজন তাদের চরম আর্থিক অনটন ও রাজশাহী নেওয়ার মতো সামর্থ্য না থাকার কথা জানিয়ে উপজেলা হাসপাতালেই চিকিৎসা দেওয়ার আকুল অনুরোধ জানান।
​স্বজনদের দাবি, চিকিৎসকের আপত্তির মুখে তারা লিখিত বন্ড স্বাক্ষর করে দেন যে হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দিলে এবং পরবর্তীতে কোনো অবনতি হলে তাদের কোনো আপত্তি থাকবে না। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, বন্ডে স্বাক্ষর নেওয়ার পরও বিকেল চারটার দিকে চিকিৎসক জোরপূর্বক তাকে রামেক হাসপাতালে রেফার করে দেন। অ্যাম্বুলেন্স বা যাতায়াতের টাকা না থাকায় শেষ পর্যন্ত তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয় এবং রাতেই (রাত আটটার দিকে) তিনি মারা যান।
​নিহতের ছেলে ও জুতাশ্রমিক অনন্ত কুমার কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ‘জুতা পালিশ করে যা আয় করি, তা দিয়েই সংসার ও মায়ের চিকিৎসা চলে। রাজশাহী নেওয়ার মতো টাকা আমার ছিল না। ডাক্তার যদি মেডিকেলে রাইখ্যা চিকিৎসা দিতো, তবে আমার মা এভাবে মরত না।’
​স্থানীয় বাসিন্দা আক্কাস আলী জানান, কিরণ বালা বাগমারা বাজার ঝাড়ু দিয়ে সপ্তাহে এক-দেড় কেজি চাল ও দোকানিদের ফেলে দেওয়া সবজি কুড়িয়ে কোনোমতে সংসার চালাতেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, বাগমারার এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সামান্য কাটা-ছেঁড়ার রোগী এলেও তাদের চিকিৎসা না দিয়ে হরহামেশা রাজশাহী রেফার করা চিকিৎসকদের একটি নিয়মে পরিণত হয়েছে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত বাগমারা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. ওয়াসি আল মোস্তাকিম জানান, রোগীর অবস্থা ভালো ছিল না বিধায় তাকে রেফার করা হয়েছে। স্বজনেরা হাসপাতালে রাখতে চাওয়ায় লিখিত নেওয়া হয়েছিল এমন কথা স্বীকার করে তিনি দাবি করেন, রোগীর এক অভিভাবক মহিলা রাখতে চাননি, তাই রেফার করা হয়েছে।
​এদিকে ওই অভিভাবক বাসন্তি রাণী এই দাবি অস্বীকার করে বলেন, ‘ডাক্তার লাল রঙের একটা কাগজ (ছাড়পত্র/রেফার চিঠি) হাতে ধরিয়ে দিয়ে রোগী নিয়ে আসতে বলায় বাধ্য হয়ে বাড়িতে আনা হয়েছে।’
​ঘটনা প্রসঙ্গে বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শংকর কে বিশ্বাস বলেন, ‘রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন ছিল এবং তাকে চিকিৎসাও দেওয়া হচ্ছিল। পরে তার স্বজনেরা অক্সিজেন খুলে বাড়িতে নিয়ে গেছে। তবে টাকার অভাবে রাজশাহী নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না এমন বিষয় আমাদের জানালে সরকারি খরচে বা বিনা খরচে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হতো।

 

ট্যাগসঃ

নিউজটি শেয়ার করুন

বিস্তারিত লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

আপলোডকারীর তথ্য

বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে না রেখে রাজশাহীতে রেফার, বাড়িতে মৃত্যু কিরণ বালার

আপডেট সময়ঃ ০৬:০৫:৫৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

 

বাগমারা প্রতিনিধি
​‘স্যার, আমরা গরিব মানুষ, আমাদের টেকা-পয়সা নাই। এটি থুইয়্যা (রেখে) চিকিৎসা দেন, রাজশাহী লিয়্যা যাওয়ার সামর্থ্য নাই’ চিকিৎসকের পায়ে ধরেও আকুতি কাজ করেনি। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকের অবহেলা ও রেফার বাণিজ্যের শিকার হয়ে টাকার অভাবে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নয়, বরং বাড়িতে এনে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন ৬৩ বছর বয়সী কিরণ বালা।
​কিরণ বালা রাজশাহীর বাগমারার বাসিন্দা। জুতা পালিশের ফাঁকে দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে নিয়মিত পত্রিকা পড়া ভাইরাল সেই অনন্ত কুমারের মা তিনি। সম্প্রতি তাকে নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ ও ভিডিও প্রচার হয়েছিল।
​পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার (২৬ অক্টোবর) দুপুরে শ্বাসকষ্টজনিত অসুস্থতা নিয়ে কিরণ বালাকে বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। কিছুক্ষণ পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে রেফার (প্রেরণ) করার পরামর্শ দেন। এ সময় পরিবারের লোকজন তাদের চরম আর্থিক অনটন ও রাজশাহী নেওয়ার মতো সামর্থ্য না থাকার কথা জানিয়ে উপজেলা হাসপাতালেই চিকিৎসা দেওয়ার আকুল অনুরোধ জানান।
​স্বজনদের দাবি, চিকিৎসকের আপত্তির মুখে তারা লিখিত বন্ড স্বাক্ষর করে দেন যে হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দিলে এবং পরবর্তীতে কোনো অবনতি হলে তাদের কোনো আপত্তি থাকবে না। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, বন্ডে স্বাক্ষর নেওয়ার পরও বিকেল চারটার দিকে চিকিৎসক জোরপূর্বক তাকে রামেক হাসপাতালে রেফার করে দেন। অ্যাম্বুলেন্স বা যাতায়াতের টাকা না থাকায় শেষ পর্যন্ত তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয় এবং রাতেই (রাত আটটার দিকে) তিনি মারা যান।
​নিহতের ছেলে ও জুতাশ্রমিক অনন্ত কুমার কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ‘জুতা পালিশ করে যা আয় করি, তা দিয়েই সংসার ও মায়ের চিকিৎসা চলে। রাজশাহী নেওয়ার মতো টাকা আমার ছিল না। ডাক্তার যদি মেডিকেলে রাইখ্যা চিকিৎসা দিতো, তবে আমার মা এভাবে মরত না।’
​স্থানীয় বাসিন্দা আক্কাস আলী জানান, কিরণ বালা বাগমারা বাজার ঝাড়ু দিয়ে সপ্তাহে এক-দেড় কেজি চাল ও দোকানিদের ফেলে দেওয়া সবজি কুড়িয়ে কোনোমতে সংসার চালাতেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, বাগমারার এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সামান্য কাটা-ছেঁড়ার রোগী এলেও তাদের চিকিৎসা না দিয়ে হরহামেশা রাজশাহী রেফার করা চিকিৎসকদের একটি নিয়মে পরিণত হয়েছে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত বাগমারা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. ওয়াসি আল মোস্তাকিম জানান, রোগীর অবস্থা ভালো ছিল না বিধায় তাকে রেফার করা হয়েছে। স্বজনেরা হাসপাতালে রাখতে চাওয়ায় লিখিত নেওয়া হয়েছিল এমন কথা স্বীকার করে তিনি দাবি করেন, রোগীর এক অভিভাবক মহিলা রাখতে চাননি, তাই রেফার করা হয়েছে।
​এদিকে ওই অভিভাবক বাসন্তি রাণী এই দাবি অস্বীকার করে বলেন, ‘ডাক্তার লাল রঙের একটা কাগজ (ছাড়পত্র/রেফার চিঠি) হাতে ধরিয়ে দিয়ে রোগী নিয়ে আসতে বলায় বাধ্য হয়ে বাড়িতে আনা হয়েছে।’
​ঘটনা প্রসঙ্গে বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শংকর কে বিশ্বাস বলেন, ‘রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন ছিল এবং তাকে চিকিৎসাও দেওয়া হচ্ছিল। পরে তার স্বজনেরা অক্সিজেন খুলে বাড়িতে নিয়ে গেছে। তবে টাকার অভাবে রাজশাহী নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না এমন বিষয় আমাদের জানালে সরকারি খরচে বা বিনা খরচে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হতো।