০৬:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬

সৌদিআরবে অগ্নিকান্ডে আত্রাইয়ের ১৩ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু, এলাকা জুড়ে শোকের ছায়া

আব্দুস ছালাম
  • আপডেট সময়ঃ ০৫:০২:২২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬
  • / ২১ বার পড়া হয়েছে।

আব্দুস ছালাম আত্রাই (নওগাঁ) প্রতিনিধি :

সৌদি আরবে একটি সোফা কারখানায় অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ১৭ জন বাংলাদেশির মার্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ১৩ জনই নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের। ওই গ্রামগুলোতে চলছে এখন শোকের মাতম। ইতোমধ্যেই উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের বাড়ি পরিদর্শন করা হয়েছে।

জানা যায়, গত রোববার বাংলাদেশি সময় অনুযায়ী বিকেল ৩ টায় সৌদি আরবের রিয়াদ মহানগরীর শিফা থানাধীন মুসাসানাইয়া শিল্প এলাকায় বাংধাদেশি কর্মীদের পরিচালনাধীন একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ১৭ জন বাংলাদেশি শ্রমিক ঘটনাস্থলেই মারা যান। তাদের মধ্যে ১৩ জনই নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা।

তারা হলেন পাঁচুপুর ইউনিয়নের পারকাসুন্দা গ্রামের মৃত তমিজ উদ্দিনের ছেলে জালাল হোসেন, মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের আক্কাছ আলীর ছেলে মিনহাজ, বিশা ইউনিয়নের ডুবাই গ্রামের চঞ্চলের ছেলে হাসিবুল হাসান শুভ, একই গ্রামের বাদল হোসেনের ছেলে সুমন হোসেন, খরসতি গ্রামের গিয়াস উদ্দিনের ছেলে সাগর হোসেন, সাধনগর গ্রামের মজনু মিয়ার ছেলে মজিদুল ইসলাম,

কালিকাপুর ইউনিয়নের গন্ডগোহালি গ্রামের গুফফার রহমানের ২ ছেলে মোহন ও সুমন, একই গ্রামের জান্নার ছেলে রুবেল হোসেন, ফজলুর ছেলে কলিমুদ্দিন, শাহাগোলা ইউনিয়নের উদনপৈ গ্রামের ময়েন শেখের ছেলে ফরিদ শেখ, আহসানগঞ্জ ইউনিয়নের বেওলা গ্রামের হৃদয় ও শাহিন। এই মর্মান্তিক ঘটনায় উপজেলা জুড়ে চলছে শোকের মাতম।

এ ঘটনায় উক্ত কারখানার একমাত্র জীবিত কর্মী গন্ডগোহালি গ্রামের হাবিবুর রহমান জানান, আমি দুপুর আনুমানিক দেড়টার দিকে চুল কাটার জন্য ওই কারখানা থেকে বেরিয়ে যাই। ফিরে এসে কাখানাতে আগুন জলতে দেখি। এ কারখানাতে মোট ১৭ জন বাংলাদেশি কর্মী কাজ করতেন। এ অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ১৬ জনই অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান।

একই সাথে তিনি আরও জানান, স্থানীয় সিভিল ডিফেন্স বলেছেন, ৮ জন সরাসরি আগুনে পুরে গেলেও অপর ৮ জন কালো ধোঁয়ায় নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যান। বিদ্যুতের সটসার্কিট থেকে এ অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত হয়েছে বলে তারা প্রাথমিকভাবে ধারনা করছেন। রোববার অগ্নিকান্ডের পরপরই সৌদি আরবের সিভিল ডিফেন্স উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেন এবং সৌদি সময় রাত ১১ টায় উদ্ধার অভিযান শেষ করেন।

সরে জমিনে গিয়ে দেখা যায় নিহতদের পরিবারে চলছে শুধুই আহাজারি। গন্ডগোহালি গ্রামের গোফফার হোসেন জানান, আমার দুই ছেলে মোহন ও সুমন ওই কারখানায় কাজ করছিল। রাতে কাজ শেষে তারা সবাই একত্রে ঘুমিয়ে পড়ে। এ সময় ওই কারখানাতে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। এ আগুনে আমার দুই সন্তানসহ মোট ৪ জন মারা যায়। আামর ছেলেরা অনেক ঋণ করে সৌদিতে যায়। প্রায় ৮ বছর ধরে কাজকাম করে ঋণ পরিশোধ করে সবেমাত্র বাড়ির কাজ শুরু করেছি। কিছুদিনের মধ্যে আমার ছেলেরা বাড়িতে এসে বিয়ে করার কথা ছিল। কিন্ত ঘাতক এ অগ্নিকান্ড আমার সব স্বপ্নকে চুরমার করে দিল।

উদনপৈ গ্রামের নিহত ফরিদের স্ত্রী সুখি বেগম জানান, আমার স্বামী ঋণ করে গত চার বছর আগে সৌদি আরবে যান। শুরুতে তেমন ভালো কিছু করতে পারেনি। আমাদের এক আতœীয়ের সুবাদে ওই কারখানায় কজ করছিল। গত রোববার বিকেলেও তার সাথে আমার কথা হয়েছে। আমার এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে আমি এখন দিশেহারা। আমার বসতবাড়ি বলতেও তেমন কিছু নেই। সরকারের কাছে আমার দাবি স্বামীর লাশটা যেন দ্রুত আমাদের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়।

আত্রাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার মনিরুজ্জামান বলেন, সৌদি আরবের রিয়াদ নগরীতে সোফা কারখানায় অগ্নিকান্ডের যে ঘটনাটি ঘটেছে এটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। এ ঘটনায় আত্রাইয়ের ১৩ জন রেমিটেন্স যোদ্ধা নিহতের সংবাদ আমরা পেয়েছি। তবে ১১ জনের নাম ঠিকানা নিশ্চিত করতে পেরেছি।

তিনি আরও বলেন, সংবাদ পাওয়ার পরপরই গভীর রাতে আমি গন্ডগোহালি গ্রামে নিহতদের পরিবারের নিকট গিয়েছিলাম। সোমবার অন্যন্যদের বাড়িতেও গিয়েছি। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করে যত দ্রুত সম্ভব তাদের লাশগুলো দেশে আনার চেষ্টা করা হবে। এদিকে একসাথে উপজেলার ১৩ জন রেমিটেন্স যোদ্ধার মার্মান্তিক মৃত্যুতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শোক বার্তা পাঠানো হয়েছে।

ট্যাগসঃ

নিউজটি শেয়ার করুন

বিস্তারিত লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

আপলোডকারীর তথ্য

সৌদিআরবে অগ্নিকান্ডে আত্রাইয়ের ১৩ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু, এলাকা জুড়ে শোকের ছায়া

আপডেট সময়ঃ ০৫:০২:২২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬

আব্দুস ছালাম আত্রাই (নওগাঁ) প্রতিনিধি :

সৌদি আরবে একটি সোফা কারখানায় অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ১৭ জন বাংলাদেশির মার্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ১৩ জনই নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের। ওই গ্রামগুলোতে চলছে এখন শোকের মাতম। ইতোমধ্যেই উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের বাড়ি পরিদর্শন করা হয়েছে।

জানা যায়, গত রোববার বাংলাদেশি সময় অনুযায়ী বিকেল ৩ টায় সৌদি আরবের রিয়াদ মহানগরীর শিফা থানাধীন মুসাসানাইয়া শিল্প এলাকায় বাংধাদেশি কর্মীদের পরিচালনাধীন একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ১৭ জন বাংলাদেশি শ্রমিক ঘটনাস্থলেই মারা যান। তাদের মধ্যে ১৩ জনই নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা।

তারা হলেন পাঁচুপুর ইউনিয়নের পারকাসুন্দা গ্রামের মৃত তমিজ উদ্দিনের ছেলে জালাল হোসেন, মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের আক্কাছ আলীর ছেলে মিনহাজ, বিশা ইউনিয়নের ডুবাই গ্রামের চঞ্চলের ছেলে হাসিবুল হাসান শুভ, একই গ্রামের বাদল হোসেনের ছেলে সুমন হোসেন, খরসতি গ্রামের গিয়াস উদ্দিনের ছেলে সাগর হোসেন, সাধনগর গ্রামের মজনু মিয়ার ছেলে মজিদুল ইসলাম,

কালিকাপুর ইউনিয়নের গন্ডগোহালি গ্রামের গুফফার রহমানের ২ ছেলে মোহন ও সুমন, একই গ্রামের জান্নার ছেলে রুবেল হোসেন, ফজলুর ছেলে কলিমুদ্দিন, শাহাগোলা ইউনিয়নের উদনপৈ গ্রামের ময়েন শেখের ছেলে ফরিদ শেখ, আহসানগঞ্জ ইউনিয়নের বেওলা গ্রামের হৃদয় ও শাহিন। এই মর্মান্তিক ঘটনায় উপজেলা জুড়ে চলছে শোকের মাতম।

এ ঘটনায় উক্ত কারখানার একমাত্র জীবিত কর্মী গন্ডগোহালি গ্রামের হাবিবুর রহমান জানান, আমি দুপুর আনুমানিক দেড়টার দিকে চুল কাটার জন্য ওই কারখানা থেকে বেরিয়ে যাই। ফিরে এসে কাখানাতে আগুন জলতে দেখি। এ কারখানাতে মোট ১৭ জন বাংলাদেশি কর্মী কাজ করতেন। এ অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ১৬ জনই অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান।

একই সাথে তিনি আরও জানান, স্থানীয় সিভিল ডিফেন্স বলেছেন, ৮ জন সরাসরি আগুনে পুরে গেলেও অপর ৮ জন কালো ধোঁয়ায় নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যান। বিদ্যুতের সটসার্কিট থেকে এ অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত হয়েছে বলে তারা প্রাথমিকভাবে ধারনা করছেন। রোববার অগ্নিকান্ডের পরপরই সৌদি আরবের সিভিল ডিফেন্স উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেন এবং সৌদি সময় রাত ১১ টায় উদ্ধার অভিযান শেষ করেন।

সরে জমিনে গিয়ে দেখা যায় নিহতদের পরিবারে চলছে শুধুই আহাজারি। গন্ডগোহালি গ্রামের গোফফার হোসেন জানান, আমার দুই ছেলে মোহন ও সুমন ওই কারখানায় কাজ করছিল। রাতে কাজ শেষে তারা সবাই একত্রে ঘুমিয়ে পড়ে। এ সময় ওই কারখানাতে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। এ আগুনে আমার দুই সন্তানসহ মোট ৪ জন মারা যায়। আামর ছেলেরা অনেক ঋণ করে সৌদিতে যায়। প্রায় ৮ বছর ধরে কাজকাম করে ঋণ পরিশোধ করে সবেমাত্র বাড়ির কাজ শুরু করেছি। কিছুদিনের মধ্যে আমার ছেলেরা বাড়িতে এসে বিয়ে করার কথা ছিল। কিন্ত ঘাতক এ অগ্নিকান্ড আমার সব স্বপ্নকে চুরমার করে দিল।

উদনপৈ গ্রামের নিহত ফরিদের স্ত্রী সুখি বেগম জানান, আমার স্বামী ঋণ করে গত চার বছর আগে সৌদি আরবে যান। শুরুতে তেমন ভালো কিছু করতে পারেনি। আমাদের এক আতœীয়ের সুবাদে ওই কারখানায় কজ করছিল। গত রোববার বিকেলেও তার সাথে আমার কথা হয়েছে। আমার এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে আমি এখন দিশেহারা। আমার বসতবাড়ি বলতেও তেমন কিছু নেই। সরকারের কাছে আমার দাবি স্বামীর লাশটা যেন দ্রুত আমাদের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়।

আত্রাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার মনিরুজ্জামান বলেন, সৌদি আরবের রিয়াদ নগরীতে সোফা কারখানায় অগ্নিকান্ডের যে ঘটনাটি ঘটেছে এটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। এ ঘটনায় আত্রাইয়ের ১৩ জন রেমিটেন্স যোদ্ধা নিহতের সংবাদ আমরা পেয়েছি। তবে ১১ জনের নাম ঠিকানা নিশ্চিত করতে পেরেছি।

তিনি আরও বলেন, সংবাদ পাওয়ার পরপরই গভীর রাতে আমি গন্ডগোহালি গ্রামে নিহতদের পরিবারের নিকট গিয়েছিলাম। সোমবার অন্যন্যদের বাড়িতেও গিয়েছি। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করে যত দ্রুত সম্ভব তাদের লাশগুলো দেশে আনার চেষ্টা করা হবে। এদিকে একসাথে উপজেলার ১৩ জন রেমিটেন্স যোদ্ধার মার্মান্তিক মৃত্যুতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শোক বার্তা পাঠানো হয়েছে।