সাজেক সংকটের নেপথ্যে আধিপত্যের লড়াই? সংলাপে সমাধান খুঁজছে সরকার
- আপডেট সময়ঃ ০২:৫৬:৪১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৭ বার পড়া হয়েছে।

আলমগীর মানিক, রাঙামাটি:
সাজেকের সংকট কি কেবল পাঁচ দফা দাবির আন্দোলন, নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াই! এমন প্রশ্নের মধ্যেই পরিস্থিতি নিরসনে সংলাপের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার ও প্রশাসন। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার পথ তৈরি করতে হেডম্যান ও কারবারিদের সম্পৃক্ত করে কমিটি গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে পর্যটনকেন্দ্রটি বন্ধ থাকায় কার স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে এবং কারা অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
রোববার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে হেডম্যান ও কারবারিদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক জরুরি সভায় পাহাড়ের চলমান অস্থিরতা নিরসনে আলোচনার ওপর গুরুত্ব দেন খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ওয়াদুদ ভূঁইয়া এবং রাঙামাটির সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান।
সভায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংলাপ, স্থানীয় নেতৃত্বের সম্পৃক্ততা এবং পাহাড়ের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানে সরকারের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, আলোচনার মাধ্যমে সংকটের গ্রহণযোগ্য সমাধান বেরিয়ে আসবে। তবে কমিটি গঠনের পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের আলোচনার টেবিলে আনা এবং সাজেকে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ওয়াদুদ ভূঁইয়া বলেন, পাহাড়ের মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা, চাঁদাবাজি বন্ধ, অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি জানান, পাহাড়ের সংকট নিরসনে সরকার তিনটি জাতীয় পর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে। এসব কমিটির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যাগুলোর সমাধান খোঁজার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন, সার্কেলপ্রধানসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
কমিটিতে আন্দোলনকারীদের রাখা হয়নি কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে ওয়াদুদ ভূঁইয়া বলেন, আলোচনায় একদিকে থাকবে সরকার, অন্যদিকে থাকবে স্থানীয় অংশীজন ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। সবাইকে একই কমিটিতে রাখা হলে আলোচনার কাঠামো কী হবে, সেটিও বিবেচনা করতে হবে।
আন্দোলনের কারণে হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও পরিবহন খাতের ব্যবসায়ী এবং শ্রমিকেরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন উল্লেখ করে তিনি সংশ্লিষ্টদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান। তাঁর প্রত্যাশা, আলোচনার উদ্যোগের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার পথ তৈরি হবে।
সাজেকের সংকট নিরসনে আলোচনার বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন রাঙামাটির সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান। তিনি বলেন, সরকার আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে চায়। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংলাপে বসার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ করে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আলোচনায় আনার চেষ্টা চলছে। এ জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।
কার সঙ্গে আলোচনা করা হবে, তা নির্ধারণ করা জরুরি উল্লেখ করে দীপেন দেওয়ান বলেন, সরকার আলোচনার দরজা বন্ধ করেনি; বরং সংলাপের মাধ্যমেই সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। দ্রুত আলোচনার পরিবেশ তৈরি হলে সংকট নিরসনের পথ বেরিয়ে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও বলেন, একটি পক্ষকে সরিয়ে অন্য পক্ষকে আলোচনায় বসানোর দাবি দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সশস্ত্র সংগঠনগুলোর উপস্থিতি ও পারস্পরিক বিরোধের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রশাসনকে আইনানুগভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।
এদিকে সাজেকের আন্দোলনে ব্যবহৃত ব্যানার, নেতৃত্ব এবং দাবিগুলোর প্রতিনিধিত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আন্দোলনকারীদের ব্যবহৃত হেডম্যান-কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের ব্যানারটি সংগঠনের নয় বলে দাবি করেছে সংশ্লিষ্ট সংগঠন। বিষয়টি নিয়ে প্রকৃত ঘটনা অনুসন্ধানে কারবারিদের নিয়ে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়েছে।
এই বিতর্ক আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। আন্দোলনকারীদের পক্ষে কারা কথা বলছেন, দাবিগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর অবস্থান কী এবং আলোচনায় কাদের প্রতিনিধিত্ব থাকবে ? সংকট নিরসনে এসব বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি হয়ে উঠেছে।
রোববারের সভায় রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী, পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আব্দুর রকিব, সামরিক ও বেসামরিক সংস্থার প্রতিনিধি এবং হেডম্যান-কারবারিরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় স্থানীয় পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে আলোচনার উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সাজেকের সংকট এখন কেবল রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব পড়ছে পর্যটন, পরিবহন, আবাসন, খাবারের দোকান, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকায়। পর্যটকদের যাতায়াত ব্যাহত হওয়ায় হোটেল-মোটেল ও রিসোর্ট ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক এবং পর্যটননির্ভর অন্যান্য পেশার মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের দাবির বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমে কীভাবে সমাধান করা হবে, তা নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা। ফলে একদিকে দাবিদাওয়া ও আঞ্চলিক বিরোধ, অন্যদিকে পর্যটননির্ভর মানুষের জীবিকা; দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কমিটি গঠন ও আলোচনার উদ্যোগকে কার্যকর করতে হলে আন্দোলনকারীদের প্রকৃত প্রতিনিধিদের চিহ্নিত করে সংলাপে বসতে হবে। পাশাপাশি দাবিগুলোর যৌক্তিকতা যাচাই, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং পর্যটনকেন্দ্রটি নিরাপদে চালুর উপযোগী পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ প্রয়োজন। শেষ পর্যন্ত সংলাপ কতটা কার্যকর হয় এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো সমাধানে কতটা আন্তরিক থাকে, তার ওপরই নির্ভর করছে সাজেকের সংকট কাটিয়ে ওঠার পথ।



















