০১:১৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬

বানারীপাড়ায় প্রশাসনের সুপারিশ ও তদন্ত প্রতিবেদন উপেক্ষিত: ১৫ কিমি দূরের ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রেই বহাল ফাজিল পরীক্ষা

রিপোর্টার নামঃ
  • আপডেট সময়ঃ ০৭:৫৪:০৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
  • / ২৩ বার পড়া হয়েছে।

বানারীপাড়া (বরিশাল) প্রতিনিধি:

বরিশালের বানারীপাড়ায় উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চাউলকাঠী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় বহাল রাখা হয়েছে ফাজিল পরীক্ষার কেন্দ্র। প্রশাসনিক তদারকিতে জটিলতা, বিগত পরীক্ষায় উত্তরপত্র (খাতা) হারিয়ে যাওয়া এবং অবাধ নকলের অভিযোগে কেন্দ্রটি স্থানান্তরের জন্য উপজেলা প্রশাসনের একাধিক চিঠি ও সরকারি তদন্ত কমিটির স্পষ্ট সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও তা উপেক্ষা করার অভিযোগ উঠেছে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়টির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দফতরে পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের কর্মকর্তারা বহাল থাকায় বর্তমান সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে ও বিতর্ক সৃষ্টির লক্ষ্যে এমন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে কেন্দ্র বহাল রাখা হয়েছে। মাঠ প্রশাসনের মতামত ও সরকারি নীতিমালার এমন ধারাবাহিক উপেক্ষায় সংশ্লিষ্ট মহলে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের জবাবদিহিতা ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে।
​নথি ও স্থানীয় সূত্র মতে, ২০২৩ সালের ফাজিল পরীক্ষা চলাকালে উক্ত কেন্দ্রে অবাধ নকলের দায়ে দুই শিক্ষার্থী বহিষ্কৃত হন। এর প্রেক্ষাপটে পরীক্ষা চলাকালে প্রশাসনিক তদারকি, নিরাপত্তা জোরদার ও নকলমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে বানারীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ২০২৫ সালের ১৯ অক্টোবর (স্মারক নং-৭৪৮) ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বরাবর কেন্দ্রটি উপজেলা সদরে অথবা বানারীপাড়া ডিগ্রি কলেজে ভেন্যু হিসেবে স্থানান্তরের লিখিত অনুরোধ জানান। তবে সেই আবেদনে কোনো সাড়া দেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের পরীক্ষা চলাকালে ওই কেন্দ্রের এক পরীক্ষার্থীর লিখিত উত্তরপত্র হারিয়ে যাওয়ার মতো গুরুতর অপরাধ ঘটে, যা নিয়ে বানারীপাড়া থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করা হয়। এ ঘটনার পর বানারীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কেন্দ্র বাতিল ও কেন্দ্র সচিবের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুনরায় চিঠি দেন (স্মারক নং-৮১৫/১, তারিখ: ১৯/১১/২০২৫)। বিষয়টি আমলে নিয়ে বরিশালের জেলা প্রশাসক ২০২৫ সালের ২৪ নভেম্বর সরকারি ফজলুল হক কলেজের অধ্যক্ষকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তদন্ত কমিটি সরেজমিনে পরিদর্শন শেষে ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে দাখিল করা প্রতিবেদনে সদরের বাইরে কেন্দ্র থাকায় তদারকিতে চরম অসুবিধার কথা উল্লেখ করে পরীক্ষা কেন্দ্রটি বাতিল, সাময়িক স্থগিত বা উপজেলা সদরে ভেন্যু স্থাপনের স্পষ্ট সুপারিশ করে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ফাজিল পরীক্ষাকে সামনে রেখেও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ২০২৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর (স্মারক নং-৫৩৭) কেন্দ্রটি সদরে প্রতিস্থাপনের তাগিদ দিয়ে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে পুনর্বার চিঠি দেন। কিন্তু প্রতিবারই জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সুপারিশ এবং তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনকে তোয়াক্কা না করে রহস্যজনকভাবে চাউলকাঠী কেন্দ্রটিকেই বহাল রাখা হয়। মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষা পরিচালনা, নিরাপত্তা বিধান এবং সরকারের কঠোর নকলবিরোধী নীতি বাস্তবায়নের প্রাথমিক দায়িত্ব উপজেলা প্রশাসনের। কিন্তু সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরের এই কেন্দ্রটিতে যাতায়াত ও তাৎক্ষণিক পরিদর্শনের বাস্তব সমস্যা থাকা সত্ত্বেও কেন বারবার এই ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে পরীক্ষা আয়োজন করা হচ্ছে এবং খাতা হারানোর মতো গুরুতর ঘটনার পরও কেন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলো না—তা নিয়ে সচেতন মহলে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। পরীক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে অবিলম্বে চাউলকাঠী কেন্দ্র বাতিল করে উপজেলা সদরে নতুন ভেন্যু নির্ধারণের জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় প্রশাসনিক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
​এ বিষয়ে বানারীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, “উক্ত মাদ্রাসাটি প্রকৃতপক্ষে পরীক্ষার জন্য অনুপযুক্ত স্থানে অবস্থিত। সেখানে নকলের বিষয়ে অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। এমনকি ওই মাদ্রাসারই এক ছাত্রের খাতা বাইরে দেওয়ার অভিযোগে একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছিল, যার প্রতিবেদনও জমা দেওয়া হয়েছে। নানা অনিয়মে অভিযুক্ত এই কেন্দ্রটি বাতিল বা স্থানান্তরের জন্য প্রশাসনের সুপারিশ ও তদন্ত প্রতিবেদন থাকা সত্ত্বেও, পৌরশহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরের এই ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে পরীক্ষা বহাল রাখার কারণ আমারও জানা নেই।”

ট্যাগসঃ

নিউজটি শেয়ার করুন

বিস্তারিত লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

আপলোডকারীর তথ্য

বানারীপাড়ায় প্রশাসনের সুপারিশ ও তদন্ত প্রতিবেদন উপেক্ষিত: ১৫ কিমি দূরের ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রেই বহাল ফাজিল পরীক্ষা

আপডেট সময়ঃ ০৭:৫৪:০৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

বানারীপাড়া (বরিশাল) প্রতিনিধি:

বরিশালের বানারীপাড়ায় উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চাউলকাঠী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় বহাল রাখা হয়েছে ফাজিল পরীক্ষার কেন্দ্র। প্রশাসনিক তদারকিতে জটিলতা, বিগত পরীক্ষায় উত্তরপত্র (খাতা) হারিয়ে যাওয়া এবং অবাধ নকলের অভিযোগে কেন্দ্রটি স্থানান্তরের জন্য উপজেলা প্রশাসনের একাধিক চিঠি ও সরকারি তদন্ত কমিটির স্পষ্ট সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও তা উপেক্ষা করার অভিযোগ উঠেছে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়টির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দফতরে পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের কর্মকর্তারা বহাল থাকায় বর্তমান সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে ও বিতর্ক সৃষ্টির লক্ষ্যে এমন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে কেন্দ্র বহাল রাখা হয়েছে। মাঠ প্রশাসনের মতামত ও সরকারি নীতিমালার এমন ধারাবাহিক উপেক্ষায় সংশ্লিষ্ট মহলে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের জবাবদিহিতা ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে।
​নথি ও স্থানীয় সূত্র মতে, ২০২৩ সালের ফাজিল পরীক্ষা চলাকালে উক্ত কেন্দ্রে অবাধ নকলের দায়ে দুই শিক্ষার্থী বহিষ্কৃত হন। এর প্রেক্ষাপটে পরীক্ষা চলাকালে প্রশাসনিক তদারকি, নিরাপত্তা জোরদার ও নকলমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে বানারীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ২০২৫ সালের ১৯ অক্টোবর (স্মারক নং-৭৪৮) ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বরাবর কেন্দ্রটি উপজেলা সদরে অথবা বানারীপাড়া ডিগ্রি কলেজে ভেন্যু হিসেবে স্থানান্তরের লিখিত অনুরোধ জানান। তবে সেই আবেদনে কোনো সাড়া দেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের পরীক্ষা চলাকালে ওই কেন্দ্রের এক পরীক্ষার্থীর লিখিত উত্তরপত্র হারিয়ে যাওয়ার মতো গুরুতর অপরাধ ঘটে, যা নিয়ে বানারীপাড়া থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করা হয়। এ ঘটনার পর বানারীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কেন্দ্র বাতিল ও কেন্দ্র সচিবের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুনরায় চিঠি দেন (স্মারক নং-৮১৫/১, তারিখ: ১৯/১১/২০২৫)। বিষয়টি আমলে নিয়ে বরিশালের জেলা প্রশাসক ২০২৫ সালের ২৪ নভেম্বর সরকারি ফজলুল হক কলেজের অধ্যক্ষকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তদন্ত কমিটি সরেজমিনে পরিদর্শন শেষে ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে দাখিল করা প্রতিবেদনে সদরের বাইরে কেন্দ্র থাকায় তদারকিতে চরম অসুবিধার কথা উল্লেখ করে পরীক্ষা কেন্দ্রটি বাতিল, সাময়িক স্থগিত বা উপজেলা সদরে ভেন্যু স্থাপনের স্পষ্ট সুপারিশ করে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ফাজিল পরীক্ষাকে সামনে রেখেও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ২০২৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর (স্মারক নং-৫৩৭) কেন্দ্রটি সদরে প্রতিস্থাপনের তাগিদ দিয়ে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে পুনর্বার চিঠি দেন। কিন্তু প্রতিবারই জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সুপারিশ এবং তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনকে তোয়াক্কা না করে রহস্যজনকভাবে চাউলকাঠী কেন্দ্রটিকেই বহাল রাখা হয়। মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষা পরিচালনা, নিরাপত্তা বিধান এবং সরকারের কঠোর নকলবিরোধী নীতি বাস্তবায়নের প্রাথমিক দায়িত্ব উপজেলা প্রশাসনের। কিন্তু সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরের এই কেন্দ্রটিতে যাতায়াত ও তাৎক্ষণিক পরিদর্শনের বাস্তব সমস্যা থাকা সত্ত্বেও কেন বারবার এই ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে পরীক্ষা আয়োজন করা হচ্ছে এবং খাতা হারানোর মতো গুরুতর ঘটনার পরও কেন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলো না—তা নিয়ে সচেতন মহলে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। পরীক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে অবিলম্বে চাউলকাঠী কেন্দ্র বাতিল করে উপজেলা সদরে নতুন ভেন্যু নির্ধারণের জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় প্রশাসনিক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
​এ বিষয়ে বানারীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, “উক্ত মাদ্রাসাটি প্রকৃতপক্ষে পরীক্ষার জন্য অনুপযুক্ত স্থানে অবস্থিত। সেখানে নকলের বিষয়ে অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। এমনকি ওই মাদ্রাসারই এক ছাত্রের খাতা বাইরে দেওয়ার অভিযোগে একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছিল, যার প্রতিবেদনও জমা দেওয়া হয়েছে। নানা অনিয়মে অভিযুক্ত এই কেন্দ্রটি বাতিল বা স্থানান্তরের জন্য প্রশাসনের সুপারিশ ও তদন্ত প্রতিবেদন থাকা সত্ত্বেও, পৌরশহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরের এই ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে পরীক্ষা বহাল রাখার কারণ আমারও জানা নেই।”