০৪:১৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৫

চারঘাটে ১হাজার হেক্টর জমির আমন চাষ অনিশ্চয়তায়, ৩ কোটি টাকা ক্ষতির শঙ্কা

শাহিনুর সুজনঃ
  • আপডেট সময়ঃ ০১:০৩:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১১ অগাস্ট ২০২৫
  • / ৩১ বার পড়া হয়েছে।

শাহিনুর সুজনঃ
রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার ভাটপাড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল কাদের (৫৭) কোমর পানিতে ডুবে যাওয়া আমন বীজতলা থেকে চারা তুলছিলেন। তিনি বললেন, “সাড়ে ছয় বিঘা জমিতে আমন আবাদ করবো। কিন্তু জমিগুলো এখন কোমর সমান পানিতে ডুবে আছে। হাঁটু পানিতে চারা নষ্ট হয়ে গেছে। যা কিছু অবশিষ্ট আছে, সেগুলো তুলেই রক্ষা করার চেষ্টা করছি। কিন্তু জমির পানি নেমে গেলেও নতুন করে চারা কিনে আবাদ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

আব্দুল কাদেরের মতো হাজারো কৃষকের একই অবস্থা। উঁচু ভূমি হিসাবে পরিচিত বরেন্দ্র অঞ্চলের বিলগুলো এবারের বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে। মূল কারণ, অপরিকল্পিতভাবে ফসলি জমিতে পুকুর খনন, খাল ভরাট, দখল এবং কালভার্টের মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়া। ফলে বৃষ্টির পানি জমে থেকে সৃষ্টি করেছে জলাবদ্ধতা, যা শুধু ফসল নয়—বসতবাড়ি পর্যন্ত প্লাবিত করছে। এই পরিস্থিতিতে কৃষকরা নিজেদের উদ্যোগে শ্যালো মেশিন বসিয়ে কিংবা নালা কেটে বিলের পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ আবার রাস্তা কেটে তৈরি করছেন নালা, যাতে জলাবদ্ধতা কিছুটা হলেও কমে। পশ্চিম ঝিকরা, বালিয়াডাঙা ও বামনদিঘী গ্রামের কৃষকেরা প্রধান সড়ক কেটে বিলের পানি বের করতে বাধ্য হয়েছেন। বালিয়াডাঙার কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন,অপরিকল্পিতভাবে পুকুর খনন করে তার পাড়ে কলাগাছ লাগিয়ে পুরো পানি চলাচলের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। এখন পানি জমে থেকেই যাচ্ছে। হাঁটুপানি জমে থাকা জমিতে কিভাবে ধান লাগাবো?

চারঘাট উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, জলাবদ্ধতায় উপজেলার অন্তত ৮০০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তবে আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহের মধ্যে পানি নেমে গেলে কৃষকরা সেখানে রোপণ করতে পারবেন। তবুও অন্তত ৩০০ থেকে ৪০০ হেক্টর জমি চাষের বাইরে থেকে যেতে পারে। তবে কৃষকেরা বলছেন, বাস্তব অবস্থা আরও ভয়াবহ। অন্তত ১,০০০ হেক্টর জমি এখনও পানির নিচে। অনেকেই বাড়ির বৃষ্টির পানি পর্যন্ত বিলের দিকে ফেলছেন, কারণ ঘরে পানি ঢুকে গেছে। কিন্তু খাল ভরাট ও পুকুরের কারণে পানি এক জায়গায় স্থির হয়ে আছে। চলমান বৃষ্টিতে এই পানি নামার কোনো সম্ভাবনাও দেখছেন না তারা। রাজশাহী আবহাওয়া অফিস জানায়, গত ২৯ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত সাত দিনে ১৬৭.৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা এ মৌসুমের সর্বোচ্চ। পরবর্তী কয়েক দিনেও একই ধরনের বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।

উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে উপজেলায় মোট পুকুরের সংখ্যা ৩,৪০২টি, যা এক যুগ আগে ছিল মাত্র ১,৯৩০টি। অর্থাৎ গত এক যুগে নতুন করে খনন হয়েছে ১,৪৭২টি পুকুর। এর মধ্যে অধিকাংশ পুকুরই খনন করা হয়েছে তিন ফসলি জমিতে এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে। এ কারণেই ফসলি জমিগুলোতে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ হারিয়ে গেছে।

শলুয়া গ্রামের কৃষক সবুর আলী বলেন,কিছু প্রভাবশালী মানুষের কারণে আমাদের জমি ডুবে গেছে। আগে বৃষ্টির পানি ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই বড়াল নদীতে চলে যেত। কিন্তু এখন খাল দখল করে ভরাট করায় আর সেই পথ নেই। চারঘাট উপজেলায় কাগজে-কলমে ছোট-বড় ২১টি খাল থাকার কথা। এর মধ্যে গঙ্গামতী খাল, ঝিনি খাল, ত্রিমহনী খাল, কাঁটা বড়াল খাল, শ্যামা সুন্দরী খাল, সলিয়ার দহ খাল, ভাটপাড়া খাল, বেলঘরিয়া খাল এবং নারদ খাল উল্লেখযোগ্য। তবে বাস্তবে এর মধ্যে ১৬টি খালের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। বাকি পাঁচটি খালও দখল, দূষণ ও অব্যবস্থাপনায় পানিপ্রবাহের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। চামটা গ্রামের কৃষক মুক্তা হোসেন বলেন,বসতবাড়ি, ক্ষেতখামার—সব পানিতে ডুবে গেছে। আমরা নিজেরাই ১৫ জন মিলে কয়েকটি খাল কাটার চেষ্টা করছি যেন দ্রুত পানি নিষ্কাশন হয়। সরদহ ইউনিয়নের খোর্দগোবিন্দপুর এলাকার বাসিন্দা সুমন আলী বলেন,কালভার্টের মুখগুলো বন্ধ হয়ে আছে। ফলে আমাদের বসতবাড়ির পানি বিলে যেতে পারছে না। বিলের পানি যাবে কোথায়? খাল নেই, পুকুর খননে সব পথ বন্ধ!

উপজেলা আদর্শ কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম বলেন, প্রতি হেক্টরে ২৫ মণ করে আমন ধান উৎপাদন হয়ে থাকে। ১,০০০ হেক্টর জমি চাষ না হলে ২৫ হাজার মণ ধান উৎপাদন হ্রাস পাবে। প্রতি মণ ধানের বাজারমূল্য ১,০০০ থেকে ১,২০০ টাকা। সেই হিসেবে চারঘাটের কৃষকের সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ ৩ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

তিনি আরও বলেন,আমরা চাই—অপরিকল্পিতভাবে পুকুর খনন বন্ধ করা হোক এবং দখলকৃত খালগুলো পুনরুদ্ধার করে পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা হোক।

চারঘাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ আল মামুন হাসান জানান, “আমরা কৃষকদের সঙ্গে নিয়ে জলাবদ্ধতা নিরসনের চেষ্টা করছি। যাতে কোনো জমিই আমন চাষের বাইরে না থাকে। এজন্য উঁচু জায়গায় অতিরিক্ত বীজতলার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ট্যাগসঃ

নিউজটি শেয়ার করুন

বিস্তারিত লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

আপলোডকারীর তথ্য

চারঘাটে ১হাজার হেক্টর জমির আমন চাষ অনিশ্চয়তায়, ৩ কোটি টাকা ক্ষতির শঙ্কা

আপডেট সময়ঃ ০১:০৩:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১১ অগাস্ট ২০২৫

শাহিনুর সুজনঃ
রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার ভাটপাড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল কাদের (৫৭) কোমর পানিতে ডুবে যাওয়া আমন বীজতলা থেকে চারা তুলছিলেন। তিনি বললেন, “সাড়ে ছয় বিঘা জমিতে আমন আবাদ করবো। কিন্তু জমিগুলো এখন কোমর সমান পানিতে ডুবে আছে। হাঁটু পানিতে চারা নষ্ট হয়ে গেছে। যা কিছু অবশিষ্ট আছে, সেগুলো তুলেই রক্ষা করার চেষ্টা করছি। কিন্তু জমির পানি নেমে গেলেও নতুন করে চারা কিনে আবাদ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

আব্দুল কাদেরের মতো হাজারো কৃষকের একই অবস্থা। উঁচু ভূমি হিসাবে পরিচিত বরেন্দ্র অঞ্চলের বিলগুলো এবারের বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে। মূল কারণ, অপরিকল্পিতভাবে ফসলি জমিতে পুকুর খনন, খাল ভরাট, দখল এবং কালভার্টের মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়া। ফলে বৃষ্টির পানি জমে থেকে সৃষ্টি করেছে জলাবদ্ধতা, যা শুধু ফসল নয়—বসতবাড়ি পর্যন্ত প্লাবিত করছে। এই পরিস্থিতিতে কৃষকরা নিজেদের উদ্যোগে শ্যালো মেশিন বসিয়ে কিংবা নালা কেটে বিলের পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ আবার রাস্তা কেটে তৈরি করছেন নালা, যাতে জলাবদ্ধতা কিছুটা হলেও কমে। পশ্চিম ঝিকরা, বালিয়াডাঙা ও বামনদিঘী গ্রামের কৃষকেরা প্রধান সড়ক কেটে বিলের পানি বের করতে বাধ্য হয়েছেন। বালিয়াডাঙার কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন,অপরিকল্পিতভাবে পুকুর খনন করে তার পাড়ে কলাগাছ লাগিয়ে পুরো পানি চলাচলের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। এখন পানি জমে থেকেই যাচ্ছে। হাঁটুপানি জমে থাকা জমিতে কিভাবে ধান লাগাবো?

চারঘাট উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, জলাবদ্ধতায় উপজেলার অন্তত ৮০০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তবে আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহের মধ্যে পানি নেমে গেলে কৃষকরা সেখানে রোপণ করতে পারবেন। তবুও অন্তত ৩০০ থেকে ৪০০ হেক্টর জমি চাষের বাইরে থেকে যেতে পারে। তবে কৃষকেরা বলছেন, বাস্তব অবস্থা আরও ভয়াবহ। অন্তত ১,০০০ হেক্টর জমি এখনও পানির নিচে। অনেকেই বাড়ির বৃষ্টির পানি পর্যন্ত বিলের দিকে ফেলছেন, কারণ ঘরে পানি ঢুকে গেছে। কিন্তু খাল ভরাট ও পুকুরের কারণে পানি এক জায়গায় স্থির হয়ে আছে। চলমান বৃষ্টিতে এই পানি নামার কোনো সম্ভাবনাও দেখছেন না তারা। রাজশাহী আবহাওয়া অফিস জানায়, গত ২৯ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত সাত দিনে ১৬৭.৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা এ মৌসুমের সর্বোচ্চ। পরবর্তী কয়েক দিনেও একই ধরনের বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।

উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে উপজেলায় মোট পুকুরের সংখ্যা ৩,৪০২টি, যা এক যুগ আগে ছিল মাত্র ১,৯৩০টি। অর্থাৎ গত এক যুগে নতুন করে খনন হয়েছে ১,৪৭২টি পুকুর। এর মধ্যে অধিকাংশ পুকুরই খনন করা হয়েছে তিন ফসলি জমিতে এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে। এ কারণেই ফসলি জমিগুলোতে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ হারিয়ে গেছে।

শলুয়া গ্রামের কৃষক সবুর আলী বলেন,কিছু প্রভাবশালী মানুষের কারণে আমাদের জমি ডুবে গেছে। আগে বৃষ্টির পানি ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই বড়াল নদীতে চলে যেত। কিন্তু এখন খাল দখল করে ভরাট করায় আর সেই পথ নেই। চারঘাট উপজেলায় কাগজে-কলমে ছোট-বড় ২১টি খাল থাকার কথা। এর মধ্যে গঙ্গামতী খাল, ঝিনি খাল, ত্রিমহনী খাল, কাঁটা বড়াল খাল, শ্যামা সুন্দরী খাল, সলিয়ার দহ খাল, ভাটপাড়া খাল, বেলঘরিয়া খাল এবং নারদ খাল উল্লেখযোগ্য। তবে বাস্তবে এর মধ্যে ১৬টি খালের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। বাকি পাঁচটি খালও দখল, দূষণ ও অব্যবস্থাপনায় পানিপ্রবাহের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। চামটা গ্রামের কৃষক মুক্তা হোসেন বলেন,বসতবাড়ি, ক্ষেতখামার—সব পানিতে ডুবে গেছে। আমরা নিজেরাই ১৫ জন মিলে কয়েকটি খাল কাটার চেষ্টা করছি যেন দ্রুত পানি নিষ্কাশন হয়। সরদহ ইউনিয়নের খোর্দগোবিন্দপুর এলাকার বাসিন্দা সুমন আলী বলেন,কালভার্টের মুখগুলো বন্ধ হয়ে আছে। ফলে আমাদের বসতবাড়ির পানি বিলে যেতে পারছে না। বিলের পানি যাবে কোথায়? খাল নেই, পুকুর খননে সব পথ বন্ধ!

উপজেলা আদর্শ কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম বলেন, প্রতি হেক্টরে ২৫ মণ করে আমন ধান উৎপাদন হয়ে থাকে। ১,০০০ হেক্টর জমি চাষ না হলে ২৫ হাজার মণ ধান উৎপাদন হ্রাস পাবে। প্রতি মণ ধানের বাজারমূল্য ১,০০০ থেকে ১,২০০ টাকা। সেই হিসেবে চারঘাটের কৃষকের সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ ৩ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

তিনি আরও বলেন,আমরা চাই—অপরিকল্পিতভাবে পুকুর খনন বন্ধ করা হোক এবং দখলকৃত খালগুলো পুনরুদ্ধার করে পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা হোক।

চারঘাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ আল মামুন হাসান জানান, “আমরা কৃষকদের সঙ্গে নিয়ে জলাবদ্ধতা নিরসনের চেষ্টা করছি। যাতে কোনো জমিই আমন চাষের বাইরে না থাকে। এজন্য উঁচু জায়গায় অতিরিক্ত বীজতলার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।