ত্রাণ মন্ত্রীর নিজ জেলা ও নিজ আসন লালমনিরহাট সদর ৩ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে নানা রকম দুর্নীতি অনিয়মের অভিযোগে ভরপুর
- আপডেট সময়ঃ ০৭:২৭:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৮ বার পড়া হয়েছে।

মুহাম্মদ রাওফুল বরাত বাঁধন ঢালী:
টিআর-কাবিখা থেকে আবাসন প্রকল্প লালমনিরহাট সদর পিআইও কার্যালয়ের প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন
বিশেষ প্রতিবেদন,
লালমনিরহাট সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়ের আওতাধীন টিআর, কাবিখা-কাবিটা ও আবাসন প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে সাপটানা আবাসন প্রকল্পের ঘর এতিম তিন ভাই বোন এর, নির্মাণ, প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনা ও কাজের মান নিয়ে স্থানীয়ভাবে ওঠা অভিযোগ এবং এ বিষয়ে প্রকাশিত সংবাদ নতুন করে প্রকল্প তদারকির বিষয়টি সামনে এনেছে।
সম্প্রতি স্থানীয় সংবাদপত্র ‘লালমনিরহাট চিত্র’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে সাপটানা আবাসন প্রকল্পের এতিম তিন ভাই বোনের জন্য একটি ঘর নির্মাণে নিম্নমানের কাজ, বৃষ্টির পানি ঘরে প্রবেশ, দরজা-জানালা ও ফ্যান না দেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরা হয়। একই প্রতিবেদনে প্রকল্পের অর্থের একটি অংশ নিয়ে প্রকল্প সভাপতি ও পিআইওর বক্তব্যে ভিন্নতা পাওয়া যায় যা অত্যান্ত লজ্জা জনক ।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রকল্পের সভাপতি রাশেদের বক্তব্য অনুযায়ী, দুটি প্রকল্পে মোট ৬ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তাঁর কাছ থেকে ৩ লাখ টাকা ফেরত নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে পিআইও আল আমিন সরকার বলেন, প্রকল্প সভাপতি কাজ না করায় তাঁর অংশের ৩ লাখ টাকা ফেরত নেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে কিন্তু সে বিভিন্ন ব্যাক্তি কারা তা জানান নি তিনি!
দুই পক্ষের বক্তব্যে অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, তা হলো—প্রকল্পের টাকা ফেরত নেওয়া হয়ে থাকলে সেটি কোন সরকারি বিধি ও প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়েছে এবং ওই অর্থের হিসাব কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
শুধু আবাসন প্রকল্প নয়, সদর উপজেলা পিআইও কার্যালয়ের অধীনে টিআর ও কাবিখা-কাবিটা কর্মসূচিরও বিপুলসংখ্যক প্রকল্প রয়েছে। সরকারি পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সদর পিআইও কার্যালয়ে টিআর এবং কাবিখা-কাবিটা কর্মসূচির উপ-বরাদ্দসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। কার্যালয়ের প্রকল্প তালিকায় মোট ৪২টি এন্ট্রি রয়েছে।
ফলে প্রশ্ন উঠছে—এসব প্রকল্পের বরাদ্দের বিপরীতে বাস্তবে কতটুকু কাজ হয়েছে, কাজের মান কেমন, প্রকল্পের মাপজোক ও বিল-ভাউচার যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমে অর্থ ব্যয়ের নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না তা কিন্তু অজানা!
আবাসন প্রকল্পের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সরকারি অর্থে নির্মিত ঘর যদি নির্মাণের পরপরই বৃষ্টির পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কিংবা অনুমোদিত সুবিধাগুলো বাস্তবে না থাকে, তাহলে প্রকল্পের নির্মাণমান ও তদারকি—দুই বিষয়ই যাচাইয়ের দাবি রাখে বলে লেখক মনে করছে ।
‘লালমনিরহাট চিত্র’-এর প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, প্রকল্পের সভাপতি কাগজে থাকলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা সীমিত ছিল। তবে এ অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রকল্পের অনুমোদনপত্র, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সিদ্ধান্ত, বরাদ্দপত্র, মাপজোক বই, বিল-ভাউচার এবং অর্থ ছাড়ের নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
টিআর ও কাবিখা-কাবিটা প্রকল্পের ক্ষেত্রেও একইভাবে কাগজে অনুমোদিত কাজ এবং মাঠপর্যায়ে সম্পন্ন কাজের তুলনামূলক যাচাই জরুরি। প্রকল্পের বরাদ্দ, প্রকৃত ব্যয়, কাজের পরিমাণ এবং সুবিধাভোগীদের বাস্তব সুবিধা—এই চারটি বিষয় একসঙ্গে পরীক্ষা করা হলে অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা থাকলে তা শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
এদিকে সরকারি তথ্য অনুযায়ী, লালমনিরহাট সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দায়িত্বে রয়েছেন মো. আল আমিন সরকার। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের তালিকাতেও তাঁর পদবি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা, লালমনিরহাট সদর হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।
এ অবস্থায় সাপটানা আবাসন প্রকল্পসহ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের টিআর, কাবিখা-কাবিটা ও অন্যান্য প্রকল্পের নথিপত্র স্বাধীনভাবে যাচাই করার দাবি উঠেছে।
বিশেষ করে তিনটি বিষয়ের নিরপেক্ষ যাচাই প্রয়োজন—
১. বরাদ্দের বিপরীতে বাস্তবে কত টাকা ব্যয় হয়েছে;
২. অনুমোদিত প্রকল্পের কাজ ও মাঠপর্যায়ের কাজের মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে কি না;
৩. প্রকল্পের অর্থ উত্তোলন, ব্যয়, ফেরত ও বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে সরকারি বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না।
অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আইনি বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়মুক্ত করার পথও খোলা রাখা প্রয়োজন।
কারণ, সরকারি প্রকল্পের অর্থ জনগণের অর্থ। সেই অর্থের প্রতিটি টাকার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। তাই লালমনিরহাট সদর পিআইও কার্যালয়ের আওতাধীন আলোচিত প্রকল্পগুলোর নথি, হিসাব ও বাস্তব কাজ একযোগে যাচাই করা হলে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে বাধ্য।
তদন্তেই নির্ধারিত হোক—অভিযোগের পেছনে বাস্তব অনিয়ম রয়েছে, নাকি প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে।
সুষ্ঠু নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানাই গরীব মেহনতী এতিমের অর্থের হিসাব চায় জনগণ।













