তানোরে আউশ ধানে প্রতি বিঘায় লোকসান ১৫ হাজার টাকা
- আপডেট সময়ঃ ১০:২৯:২৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ৩৭ বার পড়া হয়েছে।

তানোর(রাজশাহী)প্রতিনিধিঃ
রাজশাহীর তানোরে ধানের বাজারে স্মরণকালের সর্ববৃহৎ দরপতন হয়েছে।জমি ভাড়া নিয়ে আউশ ধান চাষ করে বিঘায় লোকসান হচ্ছে প্রায় ১৫ হাজার টাকা। আউশ ধান কাটা মৌসুম। মাঠজুড়ে আউশের পাকা ধানের গন্ধ। অথচ কৃষকের মুখে হাসির পরিবর্তে বিষন্নতার ছায়া।
তানোর পৌর এলাকার রহিমা ডাংগা মাঠে আউশ চাষিদের মুখে সেই হাসি নেই। বরং ধান কাটার পর হিসেব মিলছে না খাতা খুললেই আসছে লোকসান।স্থানীয় বাজারে ৬০০ টাকা মণ দরে ধান বিক্রি করে উঠছে না উৎপাদন খরচ।ফলে এসব কৃষকের ঘরে ঘরে হতাশা। কৃষিনির্ভর এসব মানুষের জীবন-জীবিকা অনেকটা ধান চাষের ওপর নির্ভরশীল। প্রতি বছর আউশ ধান কাটার পর সেই জমিতে তারা আগাম আলু চাষ করেন।কিন্তু এবার ধানের দাম এতটাই কম যে, এক মৌসুমের ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচ উঠছে না।
তানোর পৌর এলাকার রহিমা ডাংগা এলাকায় এবার প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ বিঘা জমিতে আউশ ধানের চাষ হয়েছে। বছরের পর বছর এ এলাকায় আউশ ধান চাষ হয়ে আসছে। কিন্তু কৃষকদের ভাষায়, এবার ধানের এতো কম দাম তাঁরা আগে কখনো দেখেননি। বুরুজ মহল্লার তরুণ কৃষক জুয়েল সাত বিঘা জমিতে আউশ ধান চাষ করেছেন। তিনি সেভেন ও ছিয়াত্তর জাতের ধান রোপণ করেছিলেন। ধান কাটা ও মাড়াই শেষ হলেও বিক্রি করতে গিয়ে পড়েছেন বিপাকে।জুয়েলের আক্ষেপ, ‘চাষাবাদ তাদের জীবনে অভিশাপ হয়ে উঠেছে।তিনি জানান, সামান্য কাঁচা থাকায় তার ধান কিনতে চাইছিলেন না কেউ। শেষ পর্যন্ত বস্তা ঠিকা বা ৬০০ টাকা মণ দরে ধান বিক্রি করতে হয়েছে। বিঘা প্রতি ১৮ থেকে ১৯ মণ ধান হয়েছে। কৃষকের হিসাব আরও কঠিন। রহিমা ডাংগায় অধিকাংশ কৃষক জমি ভাড়া নিয়ে চাষ করেন। কারণ আউশ ধান কাটার পর ওই জমিতেই আগাম আলু চাষ করেন তাঁরা। এক বিঘা জমির ভাড়া ১২ হাজার টাকা।
কৃষকদের হিসাবে, এক বিঘা জমিতে রোপণ থেকে ধান কাটা পর্যন্ত খরচ হয় ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা। ধান কাটা ও মাড়াইয়ে লাগে আরও প্রায় ৪ হাজার টাকা। এরপর জমি থেকে রাস্তা এবং রাস্তা থেকে বাড়িতে ধান নিতে দিতে হয় পরিবহন খরচ। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সেই ভাড়াও বেড়েছে।সব মিলে জমির ভাড়ার টাকা বাদ দিয়েই এক বিঘায় খরচ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা। সেখানে বিঘায় ১৮ মণ ধান হলে ৬০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করে পাওয়া যায় ১০ হাজার ৮০০ টাকা। অর্থাৎ শুধু উৎপাদন ও কাটাই-মাড়াইয়ের খরচ ধরলেও প্রতি বিঘায় লোকসান ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। ভাড়ার টাকা যোগ করলে বিঘা প্রতি লোকসান দাঁড়ায় প্রায় ১৬ থেকে ১৭ হাজার টাকা। লোকসানের বোঝা শুধু জুয়েল বইছেন না। রহিমা ডাংগার জয়নাল পাঁচ বিঘা, সবুজ নয় বিঘা, ভবেশ পাঁচ বিঘা এবং মইনুল সাড়ে পাঁচ বিঘা জমিতে আউশ ধান চাষ করে লোকসান গুনছেন।
এসব কৃষকদের অভিযোগ, ধান চাষের সার, কীটনাশকসহ প্রায় সব উপকরণের দাম বেড়েছে। বেড়েছে শ্রম ও পরিবহন ব্যয়ও। অথচ ধানের দাম কমছে। তাঁদের দাবি, ধান কাটার মৌসুমে একটি সিন্ডিকেট করে দাম কমিয়ে দেওয়া হয়। কৃষকের প্রশ্ন ‘সবকিছুর দাম বাড়ে, শুধু ধানের দাম কমে কেন ?’ তানোরের কৃষকদের দুর্ভোগ শুধু একটি মৌসুমের হিসাব নয়।
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে তানোরে ৮ হাজার ৫৭৫ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের চাষ হয়েছে। বর্তমানে মাঠে রয়েছে রোপা আমন। এ বছর প্রায় সাড়ে ২২ হাজার হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষ হয়েছে।
কৃষকেরা বলছেন, তানোরে কৃষিই মানুষের সংসার ও জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন। জেলার মধ্যে অন্যতম সর্বাধিক ধান উৎপাদনকারী এ উপজেলায় ধানের দাম পড়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত কৃষকেরা। ধানই যাঁদের সারা বছরের খাবারের জোগান দেয়, সেই ধানের দাম না থাকায় তাঁদের ঘরে এখন অভাব।
আশি-নব্বইয়ের দশকে কার্তিক মাসকে ঘিরে গ্রামবাংলায় অভাব-অনটন কথা শোনা যেত। কৃষকদের ভাষ্য, গত কয়েক বছর ধরে সেই অভাব যেন আবার ফিরে এসেছে। তবে এবার সেই কষ্টের কেন্দ্র কৃষক নিজেই যিনি অন্যের ঘরে খাবার পৌঁছে দেন, অথচ নিজের ঘরেই খাদ্য সংকটের শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।
কৃষকদের ক্ষোভ, তারা মাঠে ঘাম ঝরিয়ে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন। অথচ কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। তাঁদের অভিযোগ, কৃষিপণ্যের দাম নির্ধারণের দায়িত্ব কৃষি বিপণন বিভাগের হলেও কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না।
ধান ফলিয়ে যদি উৎপাদন খরচই না ওঠে, তাহলে আগামী মৌসুমে তারা কীভাবে আবার মাঠে নামবেন ? মাঠে ধান থাকবে, গোলায় ধান থাকবে; কিন্তু সেই ধানের ন্যায্য দাম না থাকলে কৃষকের ঘরে স্বস্তি ফিরবে কীভাবে ?
তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ আহমেদ বলেন, কৃষি পণ্যের দাম নির্ধারণ করে কৃষি বিপণন বিভাগ। কৃষি দপ্তর মূলত কীভাবে চাষাবাদ করতে হবে এবং রোগবালাই কীভাবে দূর করা যায়, এসব বিষয়ে কাজ করে।#









