১০:৪৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কলেজছাত্রী খাদিজা নিহতের নেপথ্যে কী

আলিফ হোসেন
  • আপডেট সময়ঃ ০৮:৩০:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ৩১ বার পড়া হয়েছে।

তানোর(রাজশাহী)প্রতিনিধিঃ
রাজশাহীর তানোরের সীমান্তবর্তী মোহনপুর উপজেলার খয়রা মোড়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত কলেজ ছাত্রী খাদিজার মৃত্যু নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে অনাকাঙ্খিত দুর্ঘটনা না পরিকল্পিত হত্যাকান্ড ?
জানা গেছে, গত ২৬ জুলাই দুপুরে রাজশাহী থেকে তীব্র গতিতে মোটরসাইকেল চালিয়ে নওগাঁর দিকে ফিরছিল মোত্তালেব। পথিমধ্যে মোহনপুরের খয়রা গ্রামের ডন এন্টারপ্রাইজের সামনের ফাঁকা সড়কে পৌঁছালে মোটরসাইকেলটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের একটি কড়াই গাছে সজোরে ধাক্কা খায়। এতে খাদিজা ছিটকে পাকা রাস্তার ওপর আছড়ে পড়েন।
এদিকে প্রথম দেখায় এটি রাজশাহী-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কের আর দশটি নিয়মিত সড়ক দুর্ঘটনার মতো মনে হলেও এর পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে অজানা রহস্য,আর উঠেছে গুরুতর অভিযোগ।আপাতত দৃষ্টিতে মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে আছড়ে পড়ার ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হলেও নিহতের শরীরে জখমের চিহ্ন থাকার অভিযোগ উঠেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য এবং অভিযুক্তের পরবর্তী পদক্ষেপ এটাকে ঠান্ডা মাথার এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দিকেই নির্দেশ করছে। ঘটনার দুই মাস পেরিয়ে গেলেও মূল অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার কিংবা আলামত জব্দ করা হয়নি।উল্টো বাদী ও বিবাদী কোনো পক্ষই আর মামলা চালাতে আগ্রহী নয়; বরং থানা পুলিশের মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষ বসে মোটা অঙ্কের বিনিময়ে আপস-মীমাংসার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়েছেন বলে আলোচনা রয়েছে। তবে মোহনপুর থানার পুলিশ আপস-মীমাংসার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
জানা যায়, নওগাঁর সাপাহার ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী খাদিজা খাতুন গত ২৫ জুলাই পরীক্ষার উদ্দেশ্যে বাবার বাড়ি থেকে বের হয়ে স্বামীর বাড়ি যাওয়ার কথা জানান। এরপর কীভাবে তিনি নিয়ামতপুরের সমাসপুর গ্রামের আলাউদ্দীন মণ্ডলের পুত্র আব্দুল মোত্তালেবের মোটরসাইকেলের সহযাত্রী হলেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
স্থানীয় সুত্র বলছে, গত ২৬ জুলাই দুপুরে রাজশাহী থেকে তীব্র গতিতে মোটরসাইকেল চালিয়ে নওগাঁর দিকে ফিরছিল মোত্তালেব। পথিমধ্যে মোহনপুরের খয়রা গ্রামের ডন এন্টারপ্রাইজের সামনের ফাঁকা সড়কে পৌঁছালে মোটরসাইকেলটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের একটি কড়াই গাছে সজোরে ধাক্কা খায়। এতে খাদিজা ছিটকে পাকা রাস্তার ওপর আছড়ে পড়েন।
এদিকে রহস্যের গভীরতা তৈরি হয়েছে দুর্ঘটনার পরবর্তী দৃশ্যপটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, গাছে ধাক্কা লেগে খাদিজা ছিটকে পড়ার পর মোত্তালেব তাঁকে বাঁচানোর কোনো চেষ্টাই করেনি। বরং নিথর অবস্থায় সড়কে পড়ে থাকা খাদিজার তলপেট ও শরীরের ওপর দিয়ে ভারী মোটরসাইকেলটি নির্মমভাবে চালিয়ে দিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। সহযাত্রীকে উদ্ধার না করে শরীরের ওপর দিয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যাওয়া কোনো আকস্মিক ভয় নয়, বরং মৃত্যু নিশ্চিত করার এক পৈশাচিক অপপ্রয়াস বলেই সাধারণ মানুষ মনে করছে। মাথায় ও পেটে ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ নিয়ে খাদিজা দীর্ঘক্ষণ সেখানে পড়েছিলেন। পরে স্থানীয়রা তাঁকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করান। সেখানে টানা চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ৫ আগস্ট রাতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি।
এদিকে ঘটনার পর নিহতের পিতা আনোয়ারুল হক বাদী হয়ে মোহনপুর থানায় ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনের ১০৫ ধারায় একটি মামলা করেন। তবে নিহতের স্বজনদের প্রাথমিক অভিযোগ ছিল, সড়ক পরিবহন আইনের ধারায় মামলা রুজু করিয়ে এক পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড আড়াল করা হচ্ছে। ব্যক্তিগত কোনো বিরোধের জেরে খাদিজাকে কৌশলে ওই নির্জন এলাকায় নিয়ে ফেলে দেওয়া হয় এবং সুপরিকল্পিতভাবে মৃত্যু নিশ্চিত করতে তাঁর শরীরের ওপর মোটরসাইকেল তুলে দেওয়া হয় বলে তার স্বজনেরা মনে করছে।
অন্যদিকে ঘটনার দুই মাস পার হলেও মামলার প্রধান আসামি মোত্তালেবকে আটক কিংবা তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি জব্দ করেনি মোহনপুর থানা পুলিশ। কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাষ্য এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং চাঞ্চল্যকর মোড় বেরিয়ে এসেছে। মামলার তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে পুরো বিষয়টি আর্থিক রফাদফার মাধ্যমে ধামাচাপা দিতে একমত হয়েছে উভয় পক্ষ বলে গুঞ্জন বইছে।বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষের আর কোনো ধরনের আইনি অভিযোগ বা আপত্তি নেই; দুই পক্ষই চায় না মামলাটি আর সামনে গড়াক বা কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া চলুক।
স্থানীয় সুত্র জানা যায়, গত ৬ সেপ্টেম্বর দুপুরে মোহনপুর থানায় এ সংক্রান্ত একটি আপস-মীমাংসার আনুষ্ঠানিক সালিশ বৈঠক বসে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন অভিযুক্ত মোত্তালেবের পিতা আলহাজ আলাউদ্দিন ও ভগ্নিপতি রিপন মাহমুদ। অন্যদিকে উপস্থিত ছিলেন বাদী আনোয়ারুল হক এবং তাঁর বড় ছেলে সারোয়ার হোসেন। মোহনপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মিজানুর রহমানের পরোক্ষ উপস্থিতিতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) আব্দুর রহিমের মধ্যস্থতায় এই সমঝোতা হয়। বৈঠকে আসামিকে আটক বা মোটরসাইকেল জব্দ না করে পুরো ঘটনাটি ১০ লাখ টাকায় আপস-মীমাংসা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৫ লাখ টাকা বাদীর পরিবার পাবে এবং অবশিষ্ট ৫ লাখ টাকা পুলিশ প্রশাসনের জন্য বরাদ্দ থাকবে বলে আলোচনা চূড়ান্ত হয় বলে জানা যায়।
সুত্র জানায়, বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষ সমঝোতায় পৌঁছানোর কারণে মামলার তদন্ত কার্যত থমকে গেছে। বাদীর বড় ছেলে সারোয়ার হোসেন থানায় বসার এবং ১০ লাখ টাকায় বিষয়টি আপস-মীমাংসা করার সত্যতা স্বীকার করেছেন। উভয় পরিবারই এখন মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার বা নিষ্পত্তি করে নিতে চাইছে। তবে এমন সমঝোতা বৈঠকে বসার কথা পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আব্দুর রহিম। তিনি দাবি করেন, থানায় বাদী বা বিবাদী কারও সঙ্গে এ ধরনের কোনো মধ্যস্থতা বা আপস-মীমাংসার বৈঠক হয়নি। অভিযোগটি সঠিক নয় দাবি করে তিনি জানান, আইন অনুযায়ী তদন্ত চলছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, ঘটনার দিন থানার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা করলেই উভয় পক্ষের দীর্ঘ উপস্থিতি ও সমঝোতা বৈঠকের আনুষ্ঠানিক সত্যতা প্রমাণ মিলবে।
এ বিষয়ে মোহনপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মিজানুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোন কথা বলতে রাজি নন। তিনি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে বলেন।
অন্যদিকে অভিযুক্ত মোত্তালেবের পিতা আলহাজ আলাউদ্দিন জানান, এটি একটি অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ছিল এবং উভয় পরিবারের সম্মতিতে সামাজিকভাবে বিষয়টি মীমাংসা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে দুই পক্ষের কাউকেই আর আইনি জটিলতায় ভোগান্তি পোহাতে না হয়।
অপরদিকে একটি অস্বাভাবিক ও নৃশংস মৃত্যুর ঘটনাকে এভাবে নিছক দুর্ঘটনা সাজিয়ে, কোনো অভিযোগ না রাখার দোহাই দিয়ে এবং আইনের বাইরে গিয়ে থানা চত্বরেই লাখ টাকার বিনিময়ে সমঝোতা করে ফেলার প্রক্রিয়া নিয়ে সচেতন মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। ফৌজদারি অপরাধ ও মৃত্যুর মতো সংবেদনশীল ঘটনা এভাবে আপসে ধামাচাপা পড়ে যাওয়া ন্যায়বিচারের পরিপন্থী বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।তারা এবিষয়ে অধিকতর তদন্তের দাবি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরী হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। #

ট্যাগসঃ

নিউজটি শেয়ার করুন

বিস্তারিত লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

আপলোডকারীর তথ্য

কলেজছাত্রী খাদিজা নিহতের নেপথ্যে কী

আপডেট সময়ঃ ০৮:৩০:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তানোর(রাজশাহী)প্রতিনিধিঃ
রাজশাহীর তানোরের সীমান্তবর্তী মোহনপুর উপজেলার খয়রা মোড়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত কলেজ ছাত্রী খাদিজার মৃত্যু নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে অনাকাঙ্খিত দুর্ঘটনা না পরিকল্পিত হত্যাকান্ড ?
জানা গেছে, গত ২৬ জুলাই দুপুরে রাজশাহী থেকে তীব্র গতিতে মোটরসাইকেল চালিয়ে নওগাঁর দিকে ফিরছিল মোত্তালেব। পথিমধ্যে মোহনপুরের খয়রা গ্রামের ডন এন্টারপ্রাইজের সামনের ফাঁকা সড়কে পৌঁছালে মোটরসাইকেলটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের একটি কড়াই গাছে সজোরে ধাক্কা খায়। এতে খাদিজা ছিটকে পাকা রাস্তার ওপর আছড়ে পড়েন।
এদিকে প্রথম দেখায় এটি রাজশাহী-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কের আর দশটি নিয়মিত সড়ক দুর্ঘটনার মতো মনে হলেও এর পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে অজানা রহস্য,আর উঠেছে গুরুতর অভিযোগ।আপাতত দৃষ্টিতে মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে আছড়ে পড়ার ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হলেও নিহতের শরীরে জখমের চিহ্ন থাকার অভিযোগ উঠেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য এবং অভিযুক্তের পরবর্তী পদক্ষেপ এটাকে ঠান্ডা মাথার এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দিকেই নির্দেশ করছে। ঘটনার দুই মাস পেরিয়ে গেলেও মূল অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার কিংবা আলামত জব্দ করা হয়নি।উল্টো বাদী ও বিবাদী কোনো পক্ষই আর মামলা চালাতে আগ্রহী নয়; বরং থানা পুলিশের মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষ বসে মোটা অঙ্কের বিনিময়ে আপস-মীমাংসার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়েছেন বলে আলোচনা রয়েছে। তবে মোহনপুর থানার পুলিশ আপস-মীমাংসার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
জানা যায়, নওগাঁর সাপাহার ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী খাদিজা খাতুন গত ২৫ জুলাই পরীক্ষার উদ্দেশ্যে বাবার বাড়ি থেকে বের হয়ে স্বামীর বাড়ি যাওয়ার কথা জানান। এরপর কীভাবে তিনি নিয়ামতপুরের সমাসপুর গ্রামের আলাউদ্দীন মণ্ডলের পুত্র আব্দুল মোত্তালেবের মোটরসাইকেলের সহযাত্রী হলেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
স্থানীয় সুত্র বলছে, গত ২৬ জুলাই দুপুরে রাজশাহী থেকে তীব্র গতিতে মোটরসাইকেল চালিয়ে নওগাঁর দিকে ফিরছিল মোত্তালেব। পথিমধ্যে মোহনপুরের খয়রা গ্রামের ডন এন্টারপ্রাইজের সামনের ফাঁকা সড়কে পৌঁছালে মোটরসাইকেলটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের একটি কড়াই গাছে সজোরে ধাক্কা খায়। এতে খাদিজা ছিটকে পাকা রাস্তার ওপর আছড়ে পড়েন।
এদিকে রহস্যের গভীরতা তৈরি হয়েছে দুর্ঘটনার পরবর্তী দৃশ্যপটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, গাছে ধাক্কা লেগে খাদিজা ছিটকে পড়ার পর মোত্তালেব তাঁকে বাঁচানোর কোনো চেষ্টাই করেনি। বরং নিথর অবস্থায় সড়কে পড়ে থাকা খাদিজার তলপেট ও শরীরের ওপর দিয়ে ভারী মোটরসাইকেলটি নির্মমভাবে চালিয়ে দিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। সহযাত্রীকে উদ্ধার না করে শরীরের ওপর দিয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যাওয়া কোনো আকস্মিক ভয় নয়, বরং মৃত্যু নিশ্চিত করার এক পৈশাচিক অপপ্রয়াস বলেই সাধারণ মানুষ মনে করছে। মাথায় ও পেটে ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ নিয়ে খাদিজা দীর্ঘক্ষণ সেখানে পড়েছিলেন। পরে স্থানীয়রা তাঁকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করান। সেখানে টানা চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ৫ আগস্ট রাতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি।
এদিকে ঘটনার পর নিহতের পিতা আনোয়ারুল হক বাদী হয়ে মোহনপুর থানায় ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনের ১০৫ ধারায় একটি মামলা করেন। তবে নিহতের স্বজনদের প্রাথমিক অভিযোগ ছিল, সড়ক পরিবহন আইনের ধারায় মামলা রুজু করিয়ে এক পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড আড়াল করা হচ্ছে। ব্যক্তিগত কোনো বিরোধের জেরে খাদিজাকে কৌশলে ওই নির্জন এলাকায় নিয়ে ফেলে দেওয়া হয় এবং সুপরিকল্পিতভাবে মৃত্যু নিশ্চিত করতে তাঁর শরীরের ওপর মোটরসাইকেল তুলে দেওয়া হয় বলে তার স্বজনেরা মনে করছে।
অন্যদিকে ঘটনার দুই মাস পার হলেও মামলার প্রধান আসামি মোত্তালেবকে আটক কিংবা তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি জব্দ করেনি মোহনপুর থানা পুলিশ। কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাষ্য এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং চাঞ্চল্যকর মোড় বেরিয়ে এসেছে। মামলার তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে পুরো বিষয়টি আর্থিক রফাদফার মাধ্যমে ধামাচাপা দিতে একমত হয়েছে উভয় পক্ষ বলে গুঞ্জন বইছে।বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষের আর কোনো ধরনের আইনি অভিযোগ বা আপত্তি নেই; দুই পক্ষই চায় না মামলাটি আর সামনে গড়াক বা কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া চলুক।
স্থানীয় সুত্র জানা যায়, গত ৬ সেপ্টেম্বর দুপুরে মোহনপুর থানায় এ সংক্রান্ত একটি আপস-মীমাংসার আনুষ্ঠানিক সালিশ বৈঠক বসে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন অভিযুক্ত মোত্তালেবের পিতা আলহাজ আলাউদ্দিন ও ভগ্নিপতি রিপন মাহমুদ। অন্যদিকে উপস্থিত ছিলেন বাদী আনোয়ারুল হক এবং তাঁর বড় ছেলে সারোয়ার হোসেন। মোহনপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মিজানুর রহমানের পরোক্ষ উপস্থিতিতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) আব্দুর রহিমের মধ্যস্থতায় এই সমঝোতা হয়। বৈঠকে আসামিকে আটক বা মোটরসাইকেল জব্দ না করে পুরো ঘটনাটি ১০ লাখ টাকায় আপস-মীমাংসা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৫ লাখ টাকা বাদীর পরিবার পাবে এবং অবশিষ্ট ৫ লাখ টাকা পুলিশ প্রশাসনের জন্য বরাদ্দ থাকবে বলে আলোচনা চূড়ান্ত হয় বলে জানা যায়।
সুত্র জানায়, বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষ সমঝোতায় পৌঁছানোর কারণে মামলার তদন্ত কার্যত থমকে গেছে। বাদীর বড় ছেলে সারোয়ার হোসেন থানায় বসার এবং ১০ লাখ টাকায় বিষয়টি আপস-মীমাংসা করার সত্যতা স্বীকার করেছেন। উভয় পরিবারই এখন মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার বা নিষ্পত্তি করে নিতে চাইছে। তবে এমন সমঝোতা বৈঠকে বসার কথা পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আব্দুর রহিম। তিনি দাবি করেন, থানায় বাদী বা বিবাদী কারও সঙ্গে এ ধরনের কোনো মধ্যস্থতা বা আপস-মীমাংসার বৈঠক হয়নি। অভিযোগটি সঠিক নয় দাবি করে তিনি জানান, আইন অনুযায়ী তদন্ত চলছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, ঘটনার দিন থানার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা করলেই উভয় পক্ষের দীর্ঘ উপস্থিতি ও সমঝোতা বৈঠকের আনুষ্ঠানিক সত্যতা প্রমাণ মিলবে।
এ বিষয়ে মোহনপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মিজানুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোন কথা বলতে রাজি নন। তিনি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে বলেন।
অন্যদিকে অভিযুক্ত মোত্তালেবের পিতা আলহাজ আলাউদ্দিন জানান, এটি একটি অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ছিল এবং উভয় পরিবারের সম্মতিতে সামাজিকভাবে বিষয়টি মীমাংসা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে দুই পক্ষের কাউকেই আর আইনি জটিলতায় ভোগান্তি পোহাতে না হয়।
অপরদিকে একটি অস্বাভাবিক ও নৃশংস মৃত্যুর ঘটনাকে এভাবে নিছক দুর্ঘটনা সাজিয়ে, কোনো অভিযোগ না রাখার দোহাই দিয়ে এবং আইনের বাইরে গিয়ে থানা চত্বরেই লাখ টাকার বিনিময়ে সমঝোতা করে ফেলার প্রক্রিয়া নিয়ে সচেতন মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। ফৌজদারি অপরাধ ও মৃত্যুর মতো সংবেদনশীল ঘটনা এভাবে আপসে ধামাচাপা পড়ে যাওয়া ন্যায়বিচারের পরিপন্থী বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।তারা এবিষয়ে অধিকতর তদন্তের দাবি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরী হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। #