০৩:৩৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬

গোদাগাড়ীতে পেঁয়াজ বীজে নীরব বিপ্লব তিন দশকের পারিবারিক ঐতিহ্যকে অনন্য উচ্চতায় নিচ্ছেন তরুণ কৃষিবিদ তাসকিন

রবিউল ইসলাম মিনাল:
  • আপডেট সময়ঃ ০৭:৪৫:১৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬
  • / ২৬ বার পড়া হয়েছে।

গোদাগাড়ী রাজশাহী জেলা প্রতিনিধি:

​রাজশাহীর গোদাগাড়ীর সরমংলা এলাকার মাটি ও মানুষের গল্প এখন পেঁয়াজ বীজের সুবাসে সুরভিত। ১৯৯২ সালে মো. মাহবুব আলমের হাত ধরে যে ক্ষুদ্র যাত্রার সূচনা হয়েছিল, তিন দশকের ব্যবধানে তা আজ দেশের কৃষি অর্থনীতিতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রে পরিণত হয়েছে। পারিবারিক সেই ঐতিহ্য আর আধুনিক কৃষিবিজ্ঞানের মেলবন্ধনে ‘মেসার্স বন্ধু বীজ ভাণ্ডার’-কে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন তরুণ কৃষিবিদ তাসকিন।
​বিশাল কর্মযজ্ঞ ও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা
​বর্তমানে কৃষিবিদ তাসকিনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে মোট ১০০ বিঘা (৩৩ একর) জমিতে পেঁয়াজ বীজের বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে। এর মধ্যে ১০ একর নিজস্ব জমি এবং বাকি ২৩ একর জমিতে চুক্তিবদ্ধ কৃষকদের মাধ্যমে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা আর নিবিড় পর্যবেক্ষণের ফলে চলতি মৌসুমে প্রতিষ্ঠানটি ১২ টন পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

​খরচের চ্যালেঞ্জ ও ‘হাত পরাগায়নে
​চলতি মৌসুমে কৃষি উপকরণের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ। এ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা জানান, ২০২০ সাল থেকে তিনি সক্রিয়ভাবে এই পেশায় যুক্ত। মাত্র দুই বছর আগেও যেখানে বিঘা প্রতি খরচ হতো ৬০-৭০ হাজার টাকা, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায়।
​খরচ বাড়ার পেছনে একটি ভিন্নধর্মী সংকটের কথা উঠে এসেছে। অত্যাধিক কীটনাশক ব্যবহারের ফলে বর্তমানে প্রাকৃতিকভাবে মৌমাছি ফুলে বসছে না। ফলে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত শ্রমিক দিয়ে ‘হাত পরাগায়ন’ (Hand Pollination) করাতে হচ্ছে। এতে বিঘা প্রতি অতিরিক্ত ১৫-২০ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে।
​মানে আপসহীন বন্ধু বীজ ভাণ্ডার
​উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও বীজের গুণগত মান নিয়ে কোনো ছাড় দিতে রাজি নন কৃষিবিদ তাসকিন। তিনি বলেন,
​লেবার বিল, সার ও কীটনাশকের দাম আগের চেয়ে অনেক বেশি। তা সত্ত্বেও আমরা মানের ক্ষেত্রে আপস করছি না। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো কৃষকদের হাতে সেরা ও রোগমুক্ত বীজ তুলে দেওয়া এবং তাদের দীর্ঘদিনের আস্থা ধরে রাখা।
​জনপ্রিয় জাত ও বাজারজাতকরণ
​প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদিত উন্নত জাতের বীজের মধ্যে রয়েছে নবাব, রুপা-১, বন্ধু কিং, তাহেরপুরি কুইন এবং ঐতিহ্যবাহী তাহেরপুরি। আকর্ষণীয় প্যাকেট ও কৌটাজাত করে এই বীজগুলো বর্তমানে পাবনা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যেই কৃষকদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে এই জাতগুলো।

​ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তিনি বলেন ধান ও সবজি বীজেও পদার্পণ
​শুধুমাত্র পেঁয়াজ নয়, মেসার্স বন্ধু বীজ ভাণ্ডার এখন তাদের পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। কৃষিবিদ তাসকিন জানান, পেঁয়াজ বীজের সফলতার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আগামীতে ধান, গম ও বিভিন্ন সবজি বীজের গবেষণা ও উৎপাদন সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
​গোদাগাড়ীর বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ মনে করেন, সরকারি ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর প্রয়োজনীয় সহযোগিতা এবং ঋণের সুবিধা পেলে এই প্রতিষ্ঠানটি দেশের পেঁয়াজ বীজের ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কৃষির উন্নয়নই দেশের উন্নয়ন—এই মূলমন্ত্রকে ধারণ করে মেসার্স বন্ধু বীজ ভাণ্ডার আজ দেশের কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম।

ট্যাগসঃ

নিউজটি শেয়ার করুন

বিস্তারিত লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

আপলোডকারীর তথ্য

গোদাগাড়ীতে পেঁয়াজ বীজে নীরব বিপ্লব তিন দশকের পারিবারিক ঐতিহ্যকে অনন্য উচ্চতায় নিচ্ছেন তরুণ কৃষিবিদ তাসকিন

আপডেট সময়ঃ ০৭:৪৫:১৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬

গোদাগাড়ী রাজশাহী জেলা প্রতিনিধি:

​রাজশাহীর গোদাগাড়ীর সরমংলা এলাকার মাটি ও মানুষের গল্প এখন পেঁয়াজ বীজের সুবাসে সুরভিত। ১৯৯২ সালে মো. মাহবুব আলমের হাত ধরে যে ক্ষুদ্র যাত্রার সূচনা হয়েছিল, তিন দশকের ব্যবধানে তা আজ দেশের কৃষি অর্থনীতিতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রে পরিণত হয়েছে। পারিবারিক সেই ঐতিহ্য আর আধুনিক কৃষিবিজ্ঞানের মেলবন্ধনে ‘মেসার্স বন্ধু বীজ ভাণ্ডার’-কে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন তরুণ কৃষিবিদ তাসকিন।
​বিশাল কর্মযজ্ঞ ও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা
​বর্তমানে কৃষিবিদ তাসকিনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে মোট ১০০ বিঘা (৩৩ একর) জমিতে পেঁয়াজ বীজের বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে। এর মধ্যে ১০ একর নিজস্ব জমি এবং বাকি ২৩ একর জমিতে চুক্তিবদ্ধ কৃষকদের মাধ্যমে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা আর নিবিড় পর্যবেক্ষণের ফলে চলতি মৌসুমে প্রতিষ্ঠানটি ১২ টন পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

​খরচের চ্যালেঞ্জ ও ‘হাত পরাগায়নে
​চলতি মৌসুমে কৃষি উপকরণের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ। এ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা জানান, ২০২০ সাল থেকে তিনি সক্রিয়ভাবে এই পেশায় যুক্ত। মাত্র দুই বছর আগেও যেখানে বিঘা প্রতি খরচ হতো ৬০-৭০ হাজার টাকা, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায়।
​খরচ বাড়ার পেছনে একটি ভিন্নধর্মী সংকটের কথা উঠে এসেছে। অত্যাধিক কীটনাশক ব্যবহারের ফলে বর্তমানে প্রাকৃতিকভাবে মৌমাছি ফুলে বসছে না। ফলে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত শ্রমিক দিয়ে ‘হাত পরাগায়ন’ (Hand Pollination) করাতে হচ্ছে। এতে বিঘা প্রতি অতিরিক্ত ১৫-২০ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে।
​মানে আপসহীন বন্ধু বীজ ভাণ্ডার
​উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও বীজের গুণগত মান নিয়ে কোনো ছাড় দিতে রাজি নন কৃষিবিদ তাসকিন। তিনি বলেন,
​লেবার বিল, সার ও কীটনাশকের দাম আগের চেয়ে অনেক বেশি। তা সত্ত্বেও আমরা মানের ক্ষেত্রে আপস করছি না। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো কৃষকদের হাতে সেরা ও রোগমুক্ত বীজ তুলে দেওয়া এবং তাদের দীর্ঘদিনের আস্থা ধরে রাখা।
​জনপ্রিয় জাত ও বাজারজাতকরণ
​প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদিত উন্নত জাতের বীজের মধ্যে রয়েছে নবাব, রুপা-১, বন্ধু কিং, তাহেরপুরি কুইন এবং ঐতিহ্যবাহী তাহেরপুরি। আকর্ষণীয় প্যাকেট ও কৌটাজাত করে এই বীজগুলো বর্তমানে পাবনা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যেই কৃষকদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে এই জাতগুলো।

​ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তিনি বলেন ধান ও সবজি বীজেও পদার্পণ
​শুধুমাত্র পেঁয়াজ নয়, মেসার্স বন্ধু বীজ ভাণ্ডার এখন তাদের পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। কৃষিবিদ তাসকিন জানান, পেঁয়াজ বীজের সফলতার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আগামীতে ধান, গম ও বিভিন্ন সবজি বীজের গবেষণা ও উৎপাদন সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
​গোদাগাড়ীর বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ মনে করেন, সরকারি ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর প্রয়োজনীয় সহযোগিতা এবং ঋণের সুবিধা পেলে এই প্রতিষ্ঠানটি দেশের পেঁয়াজ বীজের ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কৃষির উন্নয়নই দেশের উন্নয়ন—এই মূলমন্ত্রকে ধারণ করে মেসার্স বন্ধু বীজ ভাণ্ডার আজ দেশের কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম।